Friday, May 17, 2019

প্রকৃত বৈষ্ণব কে? প্রকৃত বৈষ্ণের সংজ্ঞা কি?

প্রকৃত বৈষ্ণব কে?
বেদবিদ্যানুরক্তা যে বিপ্রভক্তিরতাঃ সদা।
    নপুংসকা পরস্ত্রীষু জ্ঞেয়াস্তে বৈষ্ণবা জনাঃ।।
অনুবাদ-যাহারা বেদবিদ্যানুরক্ত,সর্ব্ব বিপ্রভক্ত ও পরদারবিমুখ
তাহারাই বৈষ্ণবজন।।
                (পদ্মপুরান,ক্রিয়াযোগসারঃ২/৯০)
নব্য বৈষ্ণব --এনারা'বিপ্রভক্তিরতা'তো দূরের কথা ব্রাহ্মণদের অপদস্হ করতে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকেন এবং বর্ণাশ্রম  মানেন না
তাছারা কলির ব্রাহ্মণদের 'রাক্ষস' বানানোর জন্য ভুয়া শ্লোখ তৈরী করতেও এনারা ওস্তাদ।এনাদের লিখিত পুস্তকে পাওয়া যায়।
কলিযুগে রাক্ষস -সকল-বিপ্রের ঘরে।
    জন্মিবেক সুজনেরে হিংসা করিবারে।
ইত্যাদি বলে বরাহ পুরানের একটি খন্ডিতাংশ প্রয়োগ করে।
সমাধান-অনুসন্ধানপূর্বক দেখা গিয়াছে রবাহ পুরানে ঐরকম কোন শ্লোখ অস্তিত নেই।যদি কলির ব্রাহ্মণ রাক্ষস হয়,তবে শ্রীচৈতন্য  মহাপ্রভু, শ্রীমন্নিত্যানন্দ মহাপ্রভু, শ্রীঅদ্বৈত মহাপ্রভু, গদাধর,শ্রীবাস,শ্রীরুপ গোস্বামী, শ্রীসনাতন গোস্বামী, শ্রীজীব গোস্বামী প্রভৃতি প্রধান প্রধান বৈষ্ণবচার্য্যগণের পরিচয় কি?কারণ'তাঁরা প্রত্যেকেই তো ব্রাহ্মণ সন্তান! সেজন্য প্রকৃত বৈষ্ণব সর্বদা বর্ণধর্মের পালন করবে এবং ব্রাহ্মণগণের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে চলবে।ব্যাসদেব বলেছেন'
        পাষণ্ডসঙ্গরহিতা বিপ্রদ্বেষবিবর্জ্জিতাঃ।
        সিঞ্চেয়ুস্তুলসীং যে চ জ্ঞাতব্যা বৈষ্ণবা নরাঃ।।
অনুবাদ-যাঁহারা পাষণ্ডসঙ্গ করেন না।ব্রাহ্মণে যাহাদের দ্বেষ নাই,এবং যাঁহারা তুলসী তরু সেক করেন,সেই নরগণকেই বৈষ্ণব বলিয়া জানিবে, 
এবিষয়ে এই ভিডিও আলোচনাটি দেখলে আরো  কিছুটা সহজে বুঝতে পারবেন। 

  
                      (পদ্মপুরান, ব্রহ্মখণ্ড ১/২৬)
অথ চ যস্ত্বিহ বা আত্নসম্ভাবনেন স্বয়মধমো
    জন্মতপোবিদ্যাচারবর্ণাশ্রমবতো বরীযকো ন বহু মন্যেত স 
    মৃতক এব মৃত্বা ক্ষারকর্দমে নিরয়েহবাক্ শিরা নিপাতিতো
    দুরন্তা যাতনা হ্যশ্নুতে।।
অনুবাদ- যে ব্যক্তি নিম্ন শ্রেনীতে জন্মগ্রহন করেও মিথ্যা অহংকারে জন্ম,তপস্যা,বিদ্যা,আচার,বর্ণ ও আশ্রম উৎকৃষ্ট পূজনীয় ব্যক্তির সম্মান না করে,সেই ব্যক্তি জিবন্নৃত।দেহান্তে তাহাকে ক্ষারকর্দম নামক নরকে অধোমুখ করিয়া নিক্ষেপ করা হয় এবং সেখানে তাকে দুরন্ত যাতনা ভোগ করিতে হয়।
ব্রাহ্মণের দ্বেষকারী ব্যক্তির ভগবানের আরাধনার কোন ফলই
   হয় না।দেখুন"
   যো বা কো বাপি বিপ্রেন্দ্র বিপ্রদ্বেষপরায়ণঃ।
   যদ্যর্চ্চয়তি গোবিন্দং সা পূজা বিফলা ভবেৎ।।
অনুবাদ- ব্রাহ্মণ প্রতি দ্বেষ-পরায়ণ যে কোন ব্যক্তি,যদি ভগবান্ গোবিন্দ্রের পুজা করে,তাহা হইলে তৎকৃত সেই পুজা বিফল হইবে।
                  (বৃহন্নারদীয়া পুরান'৩৫/৬)
 একদিকে মর্কট বাবাজীগণ বলেছেন,কলির ব্রাহ্মণ রাক্ষস, আরেকদিকে শাস্ত্রে কি বলা আছে দেখুন।
জৈমিনি ঋৃষি বলেছেন,
     তস্মৎ কলিযুগে তস্মিন ব্রাহ্মণো বিষ্ণুরেব চ।
     উভৌ গতিশ্চ সর্ব্বেষাং---!!
অনুবাদ- এই জন্য সেই বিষম কলিযুগে ব্রাহ্মণ ও বিষ্ণু এই উভয়ই
সকলের গতি।
       (স্কন্দপুরান,বিষ্ণুখন্ডে,পুরুষোত্তমহক্ষেত্রমাহাত্ন ৩৮/৪৪)
                      ''  তাই সাধু সাবধান,,
     
যারা পিতামাতা কে বরণপোষণ না করে ছুরে ফেলে,বৈষ্ণব  হওয়া জন্য পাগল"তাদের জন্য শাস্ত্রীয় কিছু রেফারেন্স  "দেখুন।
বৃহদ্ধর্ম পুরানে ব্যাসদেব বলেছেন"
  ♣পিতা যস্য ক্কচিদ্রুষ্টো ন তস্য কস্যচিদগতিঃ।
      জপো দানং তপো হোমম স্নানং তীর্থক্রিয়াবিধিঃ।
      বৃথৈব তস্য সর্ব্বাণি কর্ম্মাণ্যন্যানি কানিচিৎ।।
      করোতি সর্ব্বদেবেশং পিতরজ্ঞনুতপ্য যঃ।
       জপানি বিফলং তত্র দুগ্ধকক্ষিত্যুপ্তবীজবৎ।।
অনুবাদ- পিতা যাহার কখনও রুষ্ট হন,তাহার গতি কোথাও নাই,জপ,দান,তপস্যা,হোম,স্নান,তীর্থসেবা,বা অনন্য সমস্ত কর্ম্মই তাহার বিফল।সর্ব্বদেবতাশ্রেষ্ট পিতার উপাসনা না করিয়া যে,কোন ধর্ম্মকার্য্য করে,পিতার অনুতাপরুপ তীব্রবিষ যে পুত্রকে দুগ্ধ করে,প্রজ্বলিত ক্ষেত্রে রোপিত বীজের ন্যায় তাহার জপাদি ধর্ম্মকার্য্য বিফল হইয়া তাকে।
                (বৃহদ্ধর্ম পুরান,পূর্বাবখন্ড ১/১৮,১৯)

♣পিতৃভক্তা মাতৃভক্তা জ্ঞাতিপোষণতৎপরাঃ।
    ধর্ম্মেপদোশিন যে চ জ্ঞেয়াস্তে বৈষ্ণবা জনাঃ।।
অনুবাদ- যাহারা পিতৃমাতৃভক্ত, জ্ঞাতিপোষণরত, ও ধর্ম্মেপদোশক, তাহারাই বৈষ্ণব জন।
                 (পদ্মপুরান, ক্রিয়াযোগসারঃ২ /৮৮)

ভগবান ব্যাস বহুপূর্বেই বলেছিলেন"
♣মধুদর্শিতামার্গেন পাপিষ্ঠা বৈষ্ণবাঃ কলৌ।
    ভবিষ্যন্তি ততো ম্লেচ্ছাঃ শুদ্র যূথবহিস্কৃতাঃ।।
অনুবাদ--কলিকালে মধু-দর্শিতা-পথানুসারী পাপিষ্ঠ বৈষ্ণব অনেক হইবে,অনন্তর জাতিব্ষ্ট শূদ্র এবং ম্লেচ্ছাগণ-এই বৈষ্ণব পথাবলম্বী হইবে।
                     (সৌরপুরান-৩৯/৭৯)
শ্রীভগবান বলেছেন
 ♣মন্যুর্নিপততে যস্মিন পুত্রে পিত্রোশ্চ নিত্যশঃ
     তন্নিরয়ং নাবাধেহহংন ধাতা ন চ শঙ্করঃ।।
অনুবাদ-যে পুত্রের প্রতি পিতা বা মাতার কোপ নিপতিত হয়,আমি বিধাতা বা শঙ্কর আমরা কেহই তাহার নরক লাভের অন্তরায় হইতে পারি না।।
                    (পদ্মপুরান, সৃষ্টিখন্ড,৫০/১৭১)
দেবতা পূজা, মা বাবা ও অতিথি সেবা এবং আচার্যপথ অনুসরণ প্রসঙ্গেঃ                                                 ইসকন পন্থী বৈষ্ণব ও অন্যান্য বৈষ্ণবদের কেউ কেউ বলে থাকেন ,কৃষ্ণ উপাসনা করলে দেবতার পূজা এবং মা বাবার সেবা করার কোন প্রয়োজন নেই ।আমি মনে করি পরমেশ্বরের উপাসনার পাশাপাশি দেবতার পূজা ও মা বাবার সেবা করা অবশ্য কর্তব্য যা শাস্ত্রাজ্ঞা ।দেবতা সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের এক একটি শক্তি।দেবতা সাক্ষাত ঈশ্বর এবং মা বাবা সাক্ষাত দেবতা ।দেবতা ও মা বাবার সেবা ব্যতিরেকে সকল উপাসনা নিষ্ফল ।মা বাবাকে আঘাত দিয়ে ব্রহ্মচারী হওয়াও সঠিক নয়।কেবল মা বাবার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে বাবা মার অনুমতি সাপেক্ষে আখড়ায় অবস্থান করা ও ব্রহ্মচারী হওয়া বাঞ্ছনীয় ।আমার মতে যারা জন্মদাতা বাবা এবং গর্ভধারিণী মায়ের সাথে বিট্রে করে ,তারা  ঈশ্বরের সাথে ও বিট্রে করতে পারে ।পবিত্র কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের অংশ তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে, দেবপিতৃকার্যাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম ।মাতৃদেবো ভব।পিতৃ দেবো ভব।আচার্যদেবো ভব ।অতিথি দেব ভব।যান্যনবদ্যানি কর্মাণি ।তানি সেবিতব্যানি ।নো ইতরাণি।যান্যস্মাকং সুচরিতানি।তানি ত্বয়োপাস্যানি।নো ইতরাণি ।অর্থাৎ দেবকার্যে ও পিতৃকার্যে অমনোযোগী হবে না; মাতা,পিতা,অতিথি এবং আচার্য যেন তোমার দেবতা হন অর্থাৎ দেবতাজ্ঞানে তাঁদের পূজা করবে ।যে সকল অনুষ্ঠান অনিন্দিত তাদের অনুষ্ঠানই তোমার কর্তব্য, নিন্দিত কর্মের অনুষ্ঠান করবে না ।আমাদের সদাচারসমূহের অনুষ্ঠানই তোমার কর্তব্য, যা অসৎকর্ম তথা সদাচার নহে তার অনুষ্ঠান করবে না ।( প্রথম অধ্যায়, একাদশ অনুবাক, দুই নং মন্ত্র) এখানে দেবতার কার্য ( যজ্ঞাদি)এবং পিতৃকার্য( তর্পণাদি কর্ম) অবহিত হয়ে নিয়মমতো সম্পাদন করার কথা ও,মাতা, পিতা,আচার্য এবং অতিথিকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করার কথা বলা হয়েছে ।লোকসমাজে যে সকল কর্ম নিন্দনীয় বলে বিবেচিত হয়,সেগুলো না করার কথা এবং আচার্যগণের শোভন আচরণ অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে ।


তাহলে পবিত্র বেদের আলোকে দেবতার পূজা এবং মা বাবা,অতিথি সেবার কথা এবং আচার্যগণকে অনুসরণ করার কথা বলা থাকলেও কোন শাস্ত্রের আলোকে কেউ কেউ স্ববিরোধী কথা বলে থাকেন তা আজকের জিজ্ঞাস্য ।আর সরলমনা পাঠকরা জেনে শুনে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস রহিল । তবে যারা দেবতা পূজা এবং মা বাবার সেবা ও অতিথি সেবা শাস্ত্র বহির্ভূত মনে করেন এবং মহাজনদের পথ অনুসরণ করতে বাধা দেন তাদের ফাঁদে না পড়ার জন্য নিজে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করুন এবং সঠিক পথ খুঁজে বের করুন ।যাহোক, প্রত্যেক মত ও পথে সত্যনিষ্ঠ,আদর্শবাদী লোক আছেন যারা প্রশংসার যোগ্য ।যারা জেনে শুনে অথবা অজ্ঞতাবশতঃ মানুষকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করার করার চেষ্টা করে কেবল নিজেদের দল ভারী করতে চান তাদের থেকে সতর্ক হওয়ার জন্যই আমার লেখনী ধারণ ।মনের অজান্তে ভাষাগত দৈন্যতা ও শব্দ চয়নগত ত্রুটি বিচ্যুতিজনিত কারণে কারো মনে আঘাত দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থী ।
আধুনিক_যুগে সনাতন_জাতির_প্রথম_সংগঠক
বিভিন্ন মত এবং পথে শতধা বিভক্ত সনাতন হিন্দু ধর্মকে রক্ষার জন্য
যুগে যুগে বিভিন্ন মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে। সনাতন ধর্ম শাশ্বত এবং
ঈশ্বর প্রবর্তিত পরমমুক্তির পথ। চিরকালই এ ধর্ম ছিল, আছে এবং
থাকবে; এর কোন বিনাশ নেই কারণ ঈশ্বর স্বয়ং এ ধর্মের প্রবর্তক এবং
রক্ষাকর্তা। তাইতো যুগে যুগে এ ধর্ম কখনো সঙ্কুচিত অথবা কখনো
প্রসারিত অবস্থায় থাকে। এমনি এক সঙ্কুচিত ঘোর দুর্দিনে ভগবানের
দিব্য ঐশ্বর্যের কিঞ্চিৎ কণা নিয়ে আমাদের মাঝে আসেন এবং
আলোর পথ দেখান শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য। তাঁর জন্ম ৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দের
(মতান্তরে ৭৮৮ খ্রি.) ১২ বৈশাখ শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে কেরালা
প্রদেশের ‘কালাডি’ নামক একটি ছোট্ট গ্রামে। পিতা শিবগুরু এবং
মাতা বিশিষ্টা দেবী।
জন্ম থেকেই অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা এবং ধীশক্তির অধিকারী
ছিলেন আচার্য শঙ্কর। মাত্র তিন বছর বয়সেই তিনি তাঁর মাতৃভাষা
মালয়ালাম পড়া-লেখার দক্ষতা অর্জন করেন। এর ধারাবাহিকতায়
তাঁর বয়স যখন সাত বছর তখন তিনি বেদবেদান্তসহ বিভিন্ন
ধর্মশাস্ত্রে এবং ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি
ছিল অসাধারণ। একবার যা শুনতেন পরক্ষণেই তার অবিকল বলে দিতে
পারতেন।
সনাতন সত্য ধর্মের বিজয় পতাকা দিকে দিকে উড্ডীন করার জন্যে
আচার্য শ্রীশঙ্কর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে
বেড়িয়েছেন। পূর্বে কামরূপ (আসাম), ঢবাক (ঢাকা) থেকে পশ্চিমে
গান্ধার (আফগানিস্তান) এবং দক্ষিণে তামিলনাডু থেকে উত্তরে
তিব্বত সর্বত্র তিনি প্রচার করে বেড়িয়েছেন বৈদিক ধর্মদর্শন।
বৈদিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত এবং
ঈশ্বরই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা।
সম্রাট অশোক মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজকোষ শূন্য করে দিয়ে বৌদ্ধমত
প্রচারের নেশায় পাগলপ্রায় হয়ে যান। তিনি যুবসমাজকে কর্মবিমুখ
সন্ন্যাসের পথে প্রোৎসাহিত করেন। তিনি সৈন্যবলকে অসার ধর্মবলে
রূপান্তরিত করেন। এর ফলে ভারতবর্ষের বিদেশী শক্তির প্রতিরোধ
ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে এবং ভারতবর্ষ পরিণত হয় দুর্বলচিত্ত ক্লীবের
দেশে। ভারতবর্ষের সাথে যুগপৎ সনাতন বৈদিক ধর্মেরও এক
মহাসন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়। ভগবান বুদ্ধের প্রয়াণের কয়েকটি
শতাব্দীকাল পরে বৌদ্ধমত বিভিন্ন সম্প্রদায়ে এবং বিভিন্ন
তান্ত্রিকপন্থায় বিভক্ত হয়ে বিকৃতি লাভ করে। সেই বিকৃতি কিছুকিছু
ক্ষেত্রে ভয়ংকর অশ্লীল কামাচারে পর্যবসিত হয়ে পরে। সেই
বৌদ্ধমত এদেশবাসীকে এমনভাবে গ্রাস করে যে, বৈদিক ধর্মের
প্রাণকেন্দ্র কাশী (বেনারস, উত্তর প্রদেশ) পর্যন্ত নাস্তিক কুরুচিপূর্ণ
মতে ম্রিয়মান হয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে কাশী তখন পূজার অভাবে
গোচারণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এমনি এক বীভৎস সময়ে ধূমকেতুর মত
আচার্য শঙ্করের আবির্ভাব। তিনি বিভিন্ন নাস্তিক এবং অবৈদিক
অপসম্প্রদায়গুলোকে স্তব্ধ করে দিয়ে সত্য সনাতনের চিরন্তন পথে
আমাদের প্রবুদ্ধ করেন।
সনাতন ধর্ম পঞ্চমতে ও পথে বিভক্ত- সৌর, শাক্ত, শৈব, গাণপত্য এবং
বৈষ্ণব। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ পঞ্চ
মতাবলম্বীরা নিজেদের মাঝে সর্বদাই সাম্প্রদায়িক কলহে লিপ্ত
থাকত। এ গুরুতর সমস্যা সমাধানে অগ্রনায়ক হলেন আচার্য শ্রীশঙ্কর।
তিনিই প্রথম সর্বজনীন উপাসনা পদ্ধতির প্রবর্তন করেন এবং সব
দেবতার পূজার আগে পঞ্চমতের প্রতিনিধিত্বকারী পঞ্চদেবতার (সূর্য,
শক্তি, শিব, গণেশ, বিষ্ণু) পূজার বিধান দান করেন। এ বিধান
প্রাচীনকালেও ছিল কিন্তু মাঝে অবলুপ্ত হয়ে যায়। আচার্য পুনঃ এ
বিধান সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে সর্বপ্রকার
সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃঘাতী হিংসা-হানাহানী বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে আমাদের পূজায় ব্যবহৃত অধিকাংশ পদ্ধতিই তাঁর
নির্দেশিত।
আধুনিক হিন্দু জাতিকে প্রথম একটি সাংগঠনিক রূপ দেন শ্রীপাদ্
শঙ্করাচার্য। তিনিই প্রথম সনাতন ধর্ম রক্ষায় সংঘের পূর্ণাঙ্গ ধারণা
দেন। অবশ্য সংঘের ধারণা প্রাচীনকাল থেকে ছিল কিন্তু তা ছিল
বিচ্ছিন্ন, অপূর্ণাঙ্গ এবং প্রয়োগহীন। তাঁর প্রবর্তিত সংঘই ধর্ম রক্ষায়
একটি শক্তিশালী।
প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানই ‘শঙ্কর মঠ’ নামে আমাদের
কাছে পরিচিত। ‘শঙ্কর মঠ’ কোন একক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে
ভারতবর্ষের চারপ্রান্ত থেকে চারটি মঠের দ্বারা পরিচালিত হতে
থাকে। এ চারটি মঠ ছিল সনাতন ধর্ম রক্ষায় চারটি দুর্গের ন্যায়। সিন্ধু,
সৌবীর, মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমাঞ্চলের জন্য শারদা মঠ; অঙ্গ, বঙ্গ,
কলিঙ্গ, মগধ, উৎকল, গৌড়, সুক্ষ্ম, পৌণ্ড্র, ব্রহ্মপুত্র তীরবাসীসহ সমগ্র
পূর্বাঞ্চলের জন্য গোবর্দ্ধন মঠ; কুরুক্ষেত্র, কাশ্মীর, কম্বোজসহ সমগ্র
উত্তরাঞ্চলের জন্য জ্যোতি মঠ এবং অন্ধ্র, দ্রাবিড়, কর্ণাট, কেরল
প্রভৃতি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য শৃঙ্গেরী মঠ। শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য এ চার
মঠের আচার্য হিসেবে নিযুক্ত করেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম চার শিষ্যকে
সুরেশ্বর, পদ্মপাদ, তোটক এবং হস্তামলক। এ চার আচার্য চার মঠ থেকে
চার বেদের পূর্ণাঙ্গ বৈদিক জীবন বিধানের শিক্ষা দিতে থাকেন
দিকে দিকে। ফলে সনাতন ধর্ম একটি সুদৃঢ সাংগঠনিক রূপ পায়।
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য অধ্যাত্ম পথের পথিক এবং সাধারণ গৃহীদের
মাঝে ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্য চার মঠের অন্তর্ভূক্ত একদল সন্ন্যাসী
সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন যারা ‘ # দশনামী_সন্ন্যাসী ’ সম্প্রদায়
নামে খ্যাত। ফলে ভারতবর্ষে তৈরি হয় শক্তিশালী এক সন্ন্যাসী
সম্প্রদায়। ভারতবর্ষের অধিকাংশ ধর্মীয় মত, পথের সংগঠন এ চারমঠ
এবং দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত।
সন্ন্যাসীর আত্মপরিচয় এই পর্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দের বিবরণ
থেকে জানা যায় ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ’ শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের শৃঙ্গেরী
মঠের অধিভূক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতের
প্রাণপুরুষ শ্রীগৌরাঙ্গদেব দুজন গুরুর কাছে মন্ত্রদীক্ষা এবং সন্ন্যাস
নিয়েছিলেন; তাঁরা হলেন শ্রীঈশ্বরপুরী এবং শ্রীকেশব ভারতী।
তাঁরা দুজনেই শৃঙ্গেরী মঠভূক্ত সন্ন্যাসী। এমনকি যে নামে
শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমাদের মাঝে খ্যাত ‘শ্রীচৈতন্য’; এই ‘চৈতন্য’
নামটি শৃঙ্গেরীমঠভূক্ত ব্রহ্মচারী উপাধি। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যও
শঙ্করাচার্যের দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের পরম্পরাগত সন্ন্যাসী।
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই দশপ্রকার দশনামী
# সন্ন্যাসীদের_সনাতন_ধর্মপ্রচারে আলস্য ত্যাগ করে সদা সক্রিয়
থাকার আদেশ দিয়েছেন তাঁর তৈরি মঠানুশাসনে। সেখানে
ধর্মরক্ষার্থে তাঁর সকল সাঙ্গঠনিক রূপরেখা পাওয়া যায়। সেখান
থেকে দুটি শ্লোক উল্লেখ করছি:
যত বিনষ্টির্মহতী ধর্মস্যাত্র প্রজায়তে।
মান্দ্যং সন্ত্যাজ্যমেবাত্র দাক্ষ্যমেব সমাশ্রয়েৎ।।
ন জাতু মঠমুচ্ছিদ্যাদধিকারিণ্যুপস্থিতে।
বিঘ্নানামপি বাহুল্যাদেষ ধর্ম সনাতনঃ।।
(মঠানুশাসনম্ : ৫, ১১)
"হে আমার সন্ন্যাসীবৃন্দ ( দশনামী), এই সময়ে ধর্মের মহতী হানি
হয়েছে, তাই এই সময়ে সন্ন্যাসীদের ধর্মপ্রচারে মন্থরতা অবশ্য
পরিত্যাজ্য। ধর্মপ্রচারে সর্বদা দক্ষতার আশ্রয় করবে অর্থাৎ আলস্য
ত্যাগ করে ধর্মপ্রচারে সদা তৎপর হবে।
হে সন্ন্যাসীবৃন্দ তোমাদের বলছি, ধর্মপ্রচারে বিঘ্ন যতই অধিক হোক,
উপযুক্ত অধিকারী, যথোক্ত গুণসম্পন্ন আচার্য থাকলে, কেউ কখনও আমার
মঠ উচ্ছেদ করতে পারবে না। যেহেতু আমাদের ধর্মই সনাতন। অর্থাৎ
উপযুক্ত উপদেশকেই সনাতন ধর্মের রক্ষক এবং ধর্মের প্রচারে উপযুক্ত
উপদেশকের অভাব হইলে সেই মঠ অকর্মণ্য।"
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁর বত্রিশ বছরের সামান্য আয়ুতে অসংখ্য গ্রন্থ
রচনা করেছেন। তাঁর রচিত এখনো পর্যন্ত # ১৫১_খানা_গ্রন্থের সন্ধান
পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেদ এবং বেদান্ত দর্শনের ভাষ্য গ্রন্থের উপর ২২
খানা। এ ২২ খানা ভাষ্যগ্রন্থের মধ্যে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে
ধরা হয় ‘ব্রহ্মসূত্র’ ভাষ্য’কে। এ সূত্র ভাষ্যতেই তিনি তাঁর দার্শনিক
তত্ত্বকে সুদৃঢ় ভিত্তিমূলে প্রতিস্থাপিত করেন। আত্মতত্ত্ব এবং প্রকৃত
বৈদিক জীবন লাভের জন্য দিক-নির্দেশনামূলক আদেশ, উপদেশ এবং
প্রকরণ গ্রন্থের সংখ্যা ৫৪ খানা। দেবদেবীদের স্তবস্তুতিমূলক গ্রন্থ ৭৫
খানা। প্রচলিত অধিকাংশ স্তব স্তুতিই এ গ্রন্থগুলি থেকে নেয়া।
অসাধারণ তার ধ্বনিমাধুর্য এবং অসাধারণ তার পদলালিত্য।
আচার্যের জীবনের একটি প্রধান কীর্তি হল শ্রেষ্ঠ পবিত্র
মন্দিরগুলোতে ভগবদ্বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। জগন্নাথ ধামে কালযবনের
অত্যাচারকালে মন্দিরের সেবায়েত পাণ্ডাগণ জগন্নাথ বিগ্রহের উদর
প্রদেশ স্থিত রত্নপেটিকা চিল্কা হ্রদের তীরে ভূগর্ভে লুকিয়ে
রাখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কালক্রমে উক্ত স্থানের লোকেরা ভুলে
যান রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে। আচার্য শ্রীশঙ্কর যোগবলে
জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন এবং
পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। বদরিকাশ্রমে নারায়ণ বিগ্রহও তিনি
অনুরূপভাবে প্রকাশিত করেন।
আচার্য শ্রীশঙ্কর ছিলেন যুক্তিবাদিতার এক অত্যুজ্জ্বল বিগ্রহ। তিনি
যুক্তি বিহীন কোন কথা বলতেন না। যে কথাই বলতেন তার পিছনে
থাকতো তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি। সে অকাট্য যুক্তির জাল ছিন্ন করা ছিল
দুঃসাধ্য। কারণ তিনি ছিলেন সত্যে প্রতিষ্ঠিত। তাই তিনি যা
বলেছেন তাই সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি বৈদিক ধর্মের
পুনরুত্থান ঘটালেন শুধুমাত্র যুক্তি, মেধা, প্রজ্ঞার সহায়তায়। না কোন
রক্তপাত না কোন হানাহানি, না কোন রাজশক্তির ক্ষমতার
অপপ্রয়োগে। কোন কিছুই ধ্বংস করেন নি, করেছেন সৃষ্টি, পুনঃপ্রবর্তন।
বশিষ্ট-ব্যাসের ন্যায় মেধা প্রজ্ঞার সাথে অসাধারণ সারল্য, লাবণ্য
ছিল তাঁর সারা দেহে, তাই তাঁকে দেখে, তাঁর কথা শুনে মুগ্ধ না হয়ে
উপায় ছিল না।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের কথা ভাবলে
গা রোমাঞ্চিত হয়, ভাবি শ্রীশঙ্করাচার্য কি একজন, না শত সহস্রজন!
মাত্র বত্রিশ বছর, মহাকালের কাছে কতটুকু সময়! এ সময়ের মধ্যে একজন
ব্যক্তি এত অসাধারণ কীর্তি কি করে করলেন; এই সামান্য সময়ের মধ্যে
কিভাবে তিনি এত জনপদে ঘুরে বেরিয়েছেন; কি কৌশল অবলম্বন করে
কোটি কোটি মানুষকে সনাতন ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে
এসেছেন; এত ব্যস্ততার মধ্যেও কিভাবে তিনি ১৫১টা অমূল্য গ্রন্থের
রচনা করেছেন; এবং এত সুসংবদ্ধ, অনন্য, অভূতপূর্ব সাংগঠনিক দক্ষতা
তিনি কোথায় পেলেন?
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের সমতুল্য ব্যক্তি ভারতবর্ষে তো বটেই পৃথিবীর
ইতিহাসে বিরল। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের
যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারিনি। আচার্যের জীবনে আমরা দেখি যা
কিছু সনাতন ধর্মের সমৃদ্ধিবাচক কাজ হয়েছে তা তাঁর জীবৎকালেই
হয়েছে। তাঁর অন্তর্ধানের পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং
যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে চারমঠ আচার্যের জীবৎকালের ন্যায় নেতৃত্ব
দিতে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার কারণেই অনন্য অসাধারণ কাজের পরেও
আচার্য শ্রী শঙ্করকে আমরা ভুলতে বসেছি। আজ শ্রীপাদ্
শঙ্করাচার্যের উক্তি বিভিন্ন গুরু এবং গুরুরূপী ভগবানগণ (!) নিজেদের
নামে চালিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। কারণ এ গুরু ব্যবসা করা
কুম্ভীলকদের ধরবে কে? এর জন্য আমরাও কম দায়ী নয়। যতদিন যাচ্ছে
তত বেশি করে আমরা মূলবৃক্ষকে ছেড়ে শাখা প্রশাখায় যেয়ে বসছি
এবং তাকেই মূলবৃক্ষ বলে অভিমান করছি। সনাতন বৈদিক রাজপথ ছেড়ে
কতগুলো অপরিচ্ছন্ন অলিগলিতে যেয়ে পথহারা পথিক হয়ে বসে আছি।
অলিগলিতে চলতে চলতে আমরা টেরও পাচ্ছি না যে আমরা প হাইব্রীড ফসলে সারা দেশ ছেয়ে যাচ্ছে।
ভণ্ডদের কারণে  অসংখ্য মত পথের জঞ্জালে আমাদের যুবকসমাজ
পথহারা, ভ্রান্ত, বিপথগামী হয়ে সনাতন ধর্ম, সমাজ এবং
পারিবারিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।
পরিণামে কেউ হচ্ছে মানসিক হীনমন্য, কেউ বেছে নিচ্ছে ধর্মান্তর,
কেউবা হয়ে যাচ্ছে ঘোরতর নাস্তিক।
দক্ষিণভারতের একটি দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেয়ায়
জন্মগতভাবে শঙ্করাচার্যের মধ্যে জাতিবর্ণভেদের সংস্কারটি
ছিল। শিক্ষা দেন সকল জীবজগৎ আদতে একই ব্রহ্মের রূপ থেকে
রূপান্তর মাত্র ; অর্থাৎ প্রত্যেকটি জীবের মাঝেই একই ব্রহ্ম
বিরাজ, এই অখিল ব্রহ্মাণ্ড চিন্মাত্ররূপে বিস্তৃত, আমা কর্তৃক
ত্রিগুণময়ী অবিদ্যা দ্বারা এ অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কল্পিত হয়েছে, যে
ব্যক্তির এইপ্রকার দৃঢ বুদ্ধি সুখময় নির্মল ব্রহ্মে অটলা থাকে
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য কিভাবে সকল মানবকুল নির্বিশেষে কেমন
# একটি_ঐক্যবদ্ধ_বৈশ্বিকজাতির_কল্পনা করেছেন তার একটি অনন্য
উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর রচিত 'অন্নপূর্ণা স্ত্রোত্রম্' নামক গ্রন্থে। এ
স্তোত্রের শেষ শ্লোকে তিনি উদাত্তস্বরে বলেছেন, তাঁর মা হলেন
জগতের জননী পার্বতী এবং পিতা হলেন জগতের পিতা মহেশ্বর, আর
জগতের জনকজননীর সন্তান সকল অর্থাৎ জীবসকল হলো পরমবন্ধু ; স্বর্গ,
মর্ত ও পাতাল এ ত্রিভুবন জুড়েই হলো তাঁর স্বদেশ।
মাতা মে পার্ব্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বরঃ ।
বান্ধবাঃ শিবভক্তাশ্চ স্বদেশো ভুবনত্রয়ম্ ।।
(অন্নপূর্ণা স্ত্রোত্রম্ :১২)
জগতের মাতা ভগবতী পার্বতী হলেন আমার মা এবং জগতের পিতা
দেব মহেশ্বর হলেন আমার পিতা ; আমার পরম বান্ধব হলেন জগতের
পিতামাতার ভক্তগণ এবং স্বর্গ, মর্ত ও পাতাল এ ত্রিভুবন জুড়েই আমার
স্বদেশ।
আজ নিমজ্জমান হিন্দু জাতিকে রক্ষার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের ন্যায় তেজদীপ্ত নায়ক, সংগঠক, ব্রহ্মবাদী
এবং ঈশ্বরে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী মহামানবের। সেই পারবে হিন্দু
সমাজের অনাকাঙ্ক্ষিত জঞ্জালকে বিদূরিত করে এক ঐক্যবদ্ধ সুসংবদ্ধ
জাতিতে
পরিণত করতে। তাই সেই নতুন এক সূর্যোদয়ের আকাঙ্ক্ষী হয়ে, সেই
মহামানবের প্রতীক্ষায় আছি আমরা সকলে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের ভাষায়-
ওই মহামানব আসে,
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে॥
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক-
এল মহাজন্মের লগ্ন।
আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত
ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।
উদয়শিখরে জাগে ‘মাভৈঃ মাভৈঃ’
নবজীবনের আশ্বাসে।
সনাতন ধর্মকে নিয়ে অহেতুক সমালোচনা কাম্য নয়,
ইসলাম ধর্মের লোকদের মাঝে কেউ কেউ সনাতন ধর্মের ঈশ্বরের একত্ববাদ এবং মূর্তি পূজা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ।কেউ কেউ হিন্দু ধর্ম কোন ধর্ম নয়, স্রষ্টার একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম এবং পবিত্র কোরআন নাযিল হওয়ার পর অন্য ধর্মগ্রন্থ বাতিল এবং ইসলাম ধর্ম নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী,সনাতনধর্মের লোক  নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী নয় বলে থাকেন ।এতদবিষয়ে সনাতন ধর্মের লোকদের মাঝে সন্দেহের বা খটকার সৃষ্টি করা হয় ।আমি সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ পবিত্র বেদের আলোকে আলোচনায় ব্রতী হলাম ।সনাতন ধর্মের মহাবাক্য, একমেবাদ্বিতীয়ম (ছান্দোগ্য উপনিষদ-৬|২|১)। ঋকবেদে বলা হয়েছে, একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি (১|১৬৪|৪৬)। অর্থাৎ সদ্বস্তু এক,বিপ্ররা বহু নামে অভিহিত করে থাকেন ।সুতরাং, পবিত্র বেদ নিখুঁত একত্ববাদের ধারক।ব্রহ্মসূত্রে বলা হয়েছে, একং ব্রহ্ম, দ্বৈত নাস্তি নাহিনা নাস্তি,কিঞ্চন ।অর্থাৎ, ব্রহ্ম বা পরমেশ্বর এক, তার মতো কেউ নেই, কেউ নেই, সামান্য ও নেই ।কেউ কেউ ব্রহ্ম আর ব্রহ্মাকে এক করে ফেলেন ।ব্রহ্ম হলেন স্রষ্টা এবং ব্রহ্মা হলেন ব্রহ্মের সৃষ্ট ।ব্রহ্মার স্ত্রীলিঙ্গ ব্রহ্মাণী আছে ।ব্রহ্মের কোন লিঙ্গান্তর নেই ।ব্রহ্মের স্বরূপ ওঁ যার কোন লিঙ্গান্তর বা বচনান্তর নেই ।সনাতন ধর্মে র লোক বহুদেবতাবাদী, বহু ঈশ্বরবাদী নন ।ঈশ্বর ও দেবতা এক নন।দেবতা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এক একটি গুণের প্রতীক বা শক্তি ।আর সনাতন ধর্মের লোক মূর্তি পূজা করেন না,মূর্তিতে ঈশ্বর বা দেবতার পূজা করে থাকেন ।যদি মূর্তিকে ঈশ্বর ভেবে পূজা করা হতো, তাহলে পূজার পর মূর্তিকে বিসর্জন না দিয়ে বা গাছ তলায় না রেখে ঘরেই রাখা হতো ।দেবতা পূজা করে ঈশ্বরের সাথে অংশীদারিত্ব করা হয় সে ধারণা সঠিক নয় ।ঈশ্বর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা ,আর দেবতারা ঈশ্বর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ।ঈশ্বর এক একটি কর্মভার একেকজন দেবতার উপর অর্পণ করেন ।সকল দেবতার পূজা সমাপন করে বিষ্ণুর নামে সমর্পণ করা হয় ।ঈশ্বর সর্বব্যাপী বলে ঈশ্বরের গুণবাচক নাম বিষ্ণু ।সনাতন ধর্মের লোক পৌত্তলিক নয়,প্রতিমা পূজক ।ইসলাম ধর্ম প্রচারের আগে আরববাসী পৌত্তলিক ছিল ।তাদের পূজিত দেবতার সাথে সনাতন ধর্মের দেবতার কোন মিল নেই ।সনাতন ধর্মের দেবতা কালী, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী দেবতার নামে কোন দেবতা আরববাসীর ছিল না ।আরববাসীর লোকদের নামের সাথে সনাতন ধর্মের লোকদের নামের কোন মিল নেই ।আবু তালেব, আব্দুল মোতালেব, ওসমান, আলী,আবুবকর( রাঃ),আমেনা, ইত্যাদি নাম সনাতন ধর্মের লোকদের নেই ।।কাজেই  ,পৌত্তলিক আরববাসীকে সনাতন ধর্মের লোক বলে অভিহিত করা যথাযথ নয়। হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ) এর নির্যাতনকারী সীমার ও এজিদ এর নাম সনাতন ধর্মে নেই ।হিন্দু ধর্ম একটি ধর্ম নয়,সেই সমালোচনার বিরূপ সমালোচনা না করে বলছি ,হিন্দুধর্ম কোন ধর্ম নয়, আমাদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম ।সনাতন মানে শাশ্বত ও চিরন্তন ।হিন্দু একটি সম্প্রদায় যারা সনাতনী নামে পরিচিত ।হিন্দু তথা সনাতনীদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম ।যেমন মুসলমান একটি সম্প্রদায় এবং তাদের ধর্মের নাম ইসলাম ধর্ম ।ইসলাম ধর্মের লোকদের কেউ কেউ বলে থাকেন, কোরআন নাযিল হওয়ার পর অন্য ধর্ম গ্রন্থ বাতিল হয়ে গিয়েছে ।আমার মতে, সনাতন ধর্ম যেহেতু ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়,কাজেই তাদের ধর্ম গ্রন্থ নাযিল হওয়ার পর সনাতন ধর্মের ধর্ম গ্রন্থ বাতিল হওয়ার প্রশ্ন উঠে না ।ইসলাম ধর্মের মোট একশত চারখানা আসমানী কিতাব এবং প্রধান আসমানী কিতাব চারখানা ।একশত আসমানী কিতাবের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদসহ কোন ধর্ম গ্রন্থ থাকার কথা নয় ।কাজেই, বাতিল হওয়ার প্রশ্ন কী যুক্তিযুক্ত? ইহুদি ও খ্রিস্টান আহেলে ইসলাম বা আহেলে কিতাব ।আহলে কিতাব হলো প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের অনুসারী ।তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরীত ও ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে থাকলে তারা তা বাতিলের দাবি করতে পারেন, সনাতন ধর্মের কোনো ধর্ম গ্রন্থ নয় ।সনাতন ধর্মের সাথে ইসলাম ধর্মের কোনো বিরোধ নেই, সর্ব ক্ষেত্রে মিল ও  নেই ।স্ব স্ব ধর্মের লোকের কাছে স্ব স্ব ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম ।কোনো ব্যক্তিকে সমালোচনা করা যায়, কোন ধর্মকে সমালোচনা করা সৃষ্টির সেরা মানবজাতির ধর্ম নয় ।সনাতন ধর্মের কোনো প্রবর্তক নেই, স্বয়ং ঈশ্বর সেই ধর্মের স্রষ্টা ।বেদের ঋষিগণ প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদের দ্রষ্টা।বেদ ঈশ্বরের বাণী ।তাই, বেদ বাতিলের প্রশ্নই উঠে না ।পবিত্র বেদে ঈশ্বর নিরাকার ।তবে, দ্রষ্টা ঋষিগণ কর্তৃক বেদের কোন জায়গায় ঈশ্বরের সাকার রূপের বর্ণনা পাওয়া যায় । যজুর্বেদে বলা হয়েছে, তিনি ( পরমাত্মা) সর্ব ব্যাপক, সর্ব শক্তিমান, শরীর রহিত,রোগ রহিত, জন্ম রহিত, শুদ্ধ,নিষ্পাপ,      সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী, দুষ্টের দমনকর্তা ও অনাদি।তিনি তাঁর শাশ্বত প্রজা জীবের জন্য যথাযথ ফলের বিধান করেন(৪০|৮)।, এখানে ঈশ্বরের নিরাকারত্ব বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে ।ঋকবেদে আরো বলা হয়েছে, পুরুষের অনন্ত মস্তক, অনন্ত নয়ন,অনন্ত চরণ।তিনি বিশ্ব জগতকে- সর্বতোভাবে পরিব্যাপ্ত করে ও জীবদেহে নাভির দশাঙ্গুল উর্দ্ধে হৃদয়মধ্যে অবস্থিত আছেন ১০|৯০|১)।এখানে কিছুটা সাকার রূপের ইংগিত পেলেও পরোক্ষভাবে নিরাকারত্ব প্রকাশ পেয়েছে ।বলা হয়েছে, ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ যশঃ ।অর্থাৎ, তার কোনো প্রতিমা নেই যাঁর নাম মহৎ যশ আছে ( যজুর্বেদ-৩২|৩)।কেউ কেউ প্রতিমা শব্দকে প্রতিম হিসেবে ধরে নিয়ে তাঁর তুলনা নেই বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ।যাহোক ঈশ্বরের সাকার নিরাকার উভয় ব্যাখ্যা থাকলেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয় নাই ।তাই সনাতন ধর্মের লোকের ঈশ্বরকে সাকার নিরাকার বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে মাইনাস করার সুযোগ নেই ।সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন সর্ব প্রথম কোরান শরীফ বাংলা  ভাষায় অনুবাদ করেন ।সনাতন ধর্মে যদি সারবত্তা না থাকতো অথবা সনাতন ধর্ম কোনো ধর্ম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতেন ।সনাতন ধর্ম আদি ধর্ম।সনাতন ধর্ম শাশ্বত ও চিরন্তন যার নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে ।সনাতন ধর্মের কোনো ধর্ম সভায় অন্য ধর্মের সমালোচনা করা হয় না ।নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে অন্য ধর্মের সমালোচনা ঠিক নয় ।কোনো ধর্ম সম্পর্কে জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে সমালোচনা করা প্রকৃত ধার্মিকের পরিচয় নয়।সনাতন ধর্ম এমন একটি ধর্ম যা সব সময় শুধু সনাতন ধর্মের লোকদের জন্য নয়,সারা বিশ্ববাসীর মঙ্গল কামনা করে ।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থের আলোকে অনেক কবিতা,গান ও শ্যামা সংগীত লিখেছেন ।তিনি ইসলাম ধর্মের গজল লিখার পাশাপাশি সনাতন ধর্ম নিয়ে লিখতে ভুল করেননি ।যাহোক, সনাতন ধর্মের মতো কিছু সংখ্যক প্রজ্ঞাবান উদারপন্থী লোকও ইসলাম ধর্মে রয়েছেন যারা অন্য ধর্মের সমালোচনা করেন না ।তাদের কাছে সবিনয়ে অনুরোধ, তারা যেন সনাতন ধর্মের সমালোচনাকারীদেরকে প্রজ্ঞার বলে বুঝিয়ে সনাতন ধর্মকে অহেতুক সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করেন । ।কাউকে আঘাত করার জন্য আমার লিখার উদ্দেশ্য নয়, অকারণে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ও সনাতন ধর্ম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনার নিরসনের ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র ।আমার সতীর্থ সনাতনী ভাইবোনদের কাছে বিনীত অনুরোধ, আমার লিখার সহমত পোষণ করতে যেয়ে ইসলাম ধর্মকে আঘাত না করে মন্তব্য করবেন।পরিশেষে বলি,সনাতন ধর্মকে নিয়ে অহেতুক সমালোচনা কাম্য নয় । ।আমার লিখাকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শন করার বাসনা রইলো । আমার লিখার ভুল ভ্রান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থী ।

চার বর্ণের অশৌচ বিভ্রান্তির সমাধান

চার বর্ণের অশৌচ নিয়ে আজও বিভ্রান্তির শেষ নেই ।আজকাল কেউ কেউ সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ পালনের পক্ষপাতী ।এর সমর্থনে গরুড় পুরাণের পূর্ব খণ্ডের ৬|১০ও ৬|৪০নং এবং মনুসংহিতার ৫|৫৯নং শ্লোকের উদ্ধৃতি দেন।বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ বলেন, সপিণ্ডদিগের মরণাশৌচ দশাহ; যারা নিপূণভাবে শুদ্ধি আকাঙ্ক্ষা করেন তারা পুত্রাদি  জননে ও দশাহাশৌচ পালন করেন (৬|১০)আরো বলা হয়েছে,শ্রীকৃষ্ণ বলেন,  যে প্রেতের উদ্দেশ্য একাদশ দিনে বৃষোৎসর্গ না হয়,তার উদ্দেশ্য শত শত শ্রাদ্ধ করলে ও প্রেতত্ব বিমুক্ত হয় না ৬|৪০)।এখানে বক্তা শ্রীবিষ্ণু এবং শ্রোতা ব্রাহ্মণ কশ্যপ মুনির সন্তান বিষ্ণুভক্ত গরুড় ।উল্লেখ্য,গরুড় পুরাণে উল্লিখিত শ্রীকৃষ্ণ হলেন চতুর্ভুজা শ্রীবিষ্ণু ।কারণ, বিষ্ণুর সহস্র নামের এক নাম কৃষ্ণ ।যাহোক, তাদের ভাষায় ভগদ্বাক্য অলঙ্ঘনীয় ।আমি ও তাই বলি।এ শ্লোকগুলো কেবলমাত্র বিপ্রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ।কারণ উক্ত শ্লোকে' সর্বেষামেব বর্ণানাং ' অর্থাৎ সর্ববর্ণের উল্লেখ নেই ।তাছাড়া গরুড়ের জিজ্ঞাসার উত্তরে ভগবান বিষ্ণু অন্তেষ্টি ক্রিয়া থেকে শ্রাদ্ধ ক্রিয়া পর্যন্ত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, বিপ্রগণ বিধি অনুসারে সমস্ত কার্য করবেন ( উঃখঃ ৫|১৮০)। এই কথা বলার পর ষষ্ঠ অধ্যায়ের ১০নং শ্লোক পর্যন্ত কোন বর্ণের উল্লেখ না থাকায় তা বিপ্রদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে তা শতভাগ নিশ্চিত ।গরুড় পুরাণেই একাধিকবার চার বর্ণের ভিন্ন ভিন্ন অশৌচ বিষয়ে বলা হয়েছে ।গরুড় পুরাণের পূর্ব খণ্ডের ৫০|৮১-৮৩,১০৬|১৯,২২৬|৩৮নং শ্লোকে চার বর্ণের আলাদা আলাদা অশৌচ বর্ণনা করা হয়েছে । এবিষয়ে এখানে নিন্মে প্রদত্ত ভিডিও আলোচনাটি দেখলে আরো ক্লিয়ার হতে পারবেন, 

  
গরুড় পুরাণের পূর্ব খণ্ডের ১০৭|১০-১১নং শ্লোকে অশৌচ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ব্রহ্মবিৎ ব্রাহ্মণ প্রেতাশৌচ ও জননাশৌচ হলে তিন দিনে শুদ্ধি লাভ করবেন ।এরূপ ব্রহ্মবিৎ ক্ষত্রিয় দশ দিনে, ব্রহ্মবিৎ বৈশ্য বারদিনে এবং ঐরূপ শূদ্র ত্রিশ দিনে শুদ্ধি লাভ করবেন ।যিনি জাতি মাত্র বিপ্র তিনি দশ দিনে, জাতিমাত্রে ক্ষত্রিয় বার দিনে, জাতিমাত্র বৈশ্য পনেরো দিনে এবং জাতিমাত্র শূদ্র এক মাসে শুদ্ধ হবেন ।কাজেই, দেখা যায়, শূদ্র ব্রহ্মবিৎ হলে ও অশৌচের শিথিলতা নেই অর্থাৎ অশৌচ ত্রিশ দিন ।তাছাড়া গরুড় পুরাণের আদি বক্তা হরি বা বিষ্ণু ।তাই, সকল শ্লোক শ্রীহরি কর্তৃক সমর্থিত ।একটা জিনিস লক্ষ্য করুন, গরুড় পুরাণে শ্রীবিষ্ণুর বাচনীক বৃষোৎসর্গ না হলে শত শত শ্রাদ্ধ করলে ও প্রেতত্ব বিমুক্ত হয় না উল্লেখ থাকলেও বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ করার বিষয়ে কোন বক্তব্য সভা সমিতিতে দেয়া হয়নি ।কেবল এগারো দিনে শ্রাদ্ধ প্রতিষ্ঠিত করতে উক্ত শ্লোকের উদ্ধৃতি দেয়া হয় ।বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে, সপিণ্ডের জননে ও মরণে ব্রাহ্মণের অশৌচ দশাহ, ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশাহ, বৈশ্যের পঞ্চদশাহ এবং শূদ্রের একমাস (১৩|১৯,১১/১-৩)।বিষ্ণু পুরাণের শ্লোকগুলো গরুড় পুরাণের চার বর্ণের অশৌচ বিষয়ে শ্লোকগুলোকে পূর্ণ সমর্থন করে এবং বিপ্রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শ্লোকেরও সমর্থন দেয় ।মনুসংহিতার ৫|৫৯নং শ্লোকটি যে ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা ৫/৮৩নং শ্লোকের দ্বারা প্রমাণিত হয় ।সরলার্থ ও তাৎপর্যে বলা হয়েছে, সপিণ্ডের মৃত্যু হলে নির্গুণ ব্রাহ্মণের দশ দিন এবং গুণের তারতম্য অনুসারে চারদিন, তিন দিন কিংবা এক অহোরাত্র মাত্র অশৌচ হবে ।ব্রাহ্মণের বেদ জ্ঞান ও অগ্নিচর্যা বিবেচনা করে অশৌচ কালের এরকম তারতম্য হয়( ৫/৫৯)।উক্ত শ্লোকে ব্রাহ্মণ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও সর্ববর্ণের উল্লেখ না থাকায় ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রেই বুঝতে হবে ।১০০নং শ্লোকে বলা হয়েছে, হে দ্বিজ শ্রেষ্ঠগণ! সপিণ্ডের মৃত্যুতে অন্যান্য সপিণ্ডের পক্ষে শৌচ লাভ করার যে সব বিধান আছে, তা তোমাদের বললাম ।এখন অসপিণ্ড মরণে যে রকম অশৌচ হয়, তা আপনারা এবার শুনুন।এখানে দ্বিজ শ্রেষ্ঠ বলতে ব্রাহ্মণকে বুঝানো হয়েছে ।তাছাড়া ৮৩নং শ্লোকে বলা হয়েছে, উপনীত সপিণ্ডের মরণে বা জননে ব্রাহ্মণেরা দশ দিনে শুদ্ধ হন, ক্ষত্রিয়েরা দ্বাদশ দিনে, বৈশ্যেরা পঞ্চদশ দিনে এবং শূদ্র এক মাসে শুদ্ধ হন ।৫৯নং শ্লোকে গুণের তারতম্য অনুসারে তিন দিন ও এক অহোরাত্র অশৌচের কথা বলা হয়েছে ।যে ব্রাহ্মণ সাগ্নিক ও স্বাধ্যায় পাঠে নিরত তাঁর একদিন অশৌচ হয় ।নিরগ্নি ও কেবলমাত্র স্বাধ্যায় পাঠে নিরত ব্রাহ্মণের তিন দিন এবং জাতিমাত্রে ব্রাহ্মণের দশদিন অশৌচ হয় ।একাহাচ্চুদদ্ধতে বিপ্রোহযাগ্নি বেদ সমন্বিতঃ।ত্র্যহং কেবল বেদস্তুদ্বিহীন দশভির্দ্দিনৈঃ।।কাজেই, ৫৯নং শ্লোকটি কেবল ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা প্রমাণিত ।সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ এর সমর্থনে, 'এই শ্লোকের উদ্ধৃতি  দেয়া হয়, ' সর্ব্বেষামেব বর্ণানাং সূতকে মৃতকে তথা ।দশাহাচ্ছুদ্ধিরেতষামিতি শাতাতপঃ অব্রবীৎ।।মিতাক্ষরায় উক্ত অঙ্গিরা বচন ।উক্ত শ্লোকে বুঝা যায় অঙ্গিরা ঋষি শাতাতপঃ ঋষির বরাত দিয়ে বলেছেন সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ ।এই শ্লোকটির কোন শ্লোক সংখ্যা উল্লেখ নাই।তাছাড়া অঙ্গিরা সংহিতায় বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ দশ দিনে শুদ্ধ হন,ক্ষত্রিয় বার দিনে, বৈশ্য এক পক্ষে  এবং শূদ্র এক মাসে শুদ্ধ হন (৫১নং শ্লোক)।অন্যত্র বলা হয়েছে, শাতাতপ ঋষি বলেছেন, ক্ষত্রিয় এগার দিনে, বৈশ্য বার দিনে এবং শূদ্র বিশ দিনে শুচি হবে ( লেখকঃ জিতেন্দ্রিয় দাসের শ্রাদ্ধ তত্ত্ব বিচার- ইসকন) উক্ত লেখক প্রাগোক্ত সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ পালনের শ্লোকটি উপহার দিয়ে সর্ববর্ণেদশাহাশৌচ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন ।কিন্তু আঙ্গিরা ও শাতাতপার আলোচ্য শ্লোক থেকে আপনারাই বিচার করুন কোনটা সঠিক হবে?ইসকন প্রকাশিত :শ্রীল রূপ গোস্বামী প্রভুপাদ বিরচিত  ভক্তি রসামৃত গ্রন্থে অষ্টম অধ্যায়ে বর্জনীয় অপরাধ বিষয়ে বলা হয়েছে, দূষিত অবস্থায় মন্দিরে প্রবেশ করা উচিত নয় (বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী পরিবারের পরিবারে কারো মৃত্যু হওয়ার পর সমস্ত পরিবারই কিছু দিনের জন্য অশুচি হয়ে যায় ।ব্রাহ্মণদের এই অশৌচ অবস্থা বারো দিন থাকে ।ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের পনেরো দিন এবং শূদ্রের জন্য ত্রিশ দিন ।তাহলে বিচার করুন,জিতেন্দ্রিয় দাসের সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ কতটুকু গ্রহণযোগ্য তাছাড়া অত্রি সংহিতার"৮৫নং,যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতার ৩|২২, উশন সংহিতার ৬|৩৪,সংবর্ত্ত সংহিতার ৩৮নং শ্লোক, পরাশর সংহিতার ৩|৪, শংখ সংহিতার১৫|২-৩,গৌতম সংহিতার চৌদ্দ অধ্যায়ে, কুর্ম পুরাণের ২৩|৩৮, পদ্ম পুরাণ,ব্রহ্ম পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, মার্কণ্ড পুরাণ, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ,মৎস পুরাণসহ অসংখ্য পুরাণ ও সংহিতায় চার বর্ণের আলাদা আলাদা অশৌচ বর্ণনা করা হয়েছে ।এতগুলো পুরাণ ও স্মৃতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই ।তাছাড়া কেউ কেউ বার দিন, আবার কেউ পনেরো দিন অশৌচ পালন করে শ্রাদ্ধাদি কার্য করে থাকেন ।সুবিধাবাদী ব্যবস্থাপকরা ব্যবস্থা  দিয়ে থাকেন ।সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত থাকলে বারো দিন ও পনের দিনের অশৌচ পালনের সিদ্ধান্ত দিতেন না ।কেউ কেউ বলেন, বর্তমান যুগে মানুষের চাকুরি বা অন্যান্য  সমস্যার কথা বিবেচনা করে অশৌচ কমিয়ে দেন।শাস্ত্রীয় বিধান পরিবর্তন করার কী সুযোগ আছে সভা সমিতি করে ।তবে অশৌচ বিধি যদি শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে তাহলে তো তিন দিনে বা একদিনে শ্রাদ্ধ করা যায় ।আর শূদ্রের শ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণ না আনলেও তো হয় ।মনু বলেছেন, স্ত্রী ও শূদ্র অমন্ত্রক শ্রাদ্ধ করতে পারবে ।ব্রাহ্মণের ব্যবসায় হাত দিলাম ।একথা বললাম এজন্য, আজও ব্রাহ্মণরাই তো কেউ কেউ অশৌচ থাকতে, কেউ অশৌচান্তে শ্রাদ্ধ ক্রিয়া করাচ্ছেন ।সকল ব্রাহ্মণ শাস্ত্রীয়ভাবেএক মতে নিজের ও যজমানের মঙ্গলের কথা ভাবেন, ইহকাল ও পরকালের কথা ভাবেন ।আমি কাউকে উপদেশ দিচ্ছিনা ।উপদেশ দেবার মতো ক্ষমতা ও আমার নেই ।সমাজের দায় বদ্ধতা থেকেলও ফেইসবুক বন্ধুদের প্রশ্নের আলোকে আমার লিখা ।বর্তমান যুগের পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে অশৌচ কমানোর বিষয়ে মত প্রকাশ করতে প্রবল ইচ্ছে থাকলে ও শাস্ত্র পাঠ করে শাস্ত্রের বাহিরে সিদ্ধান্ত দিতে বিবেক বাধা দেয় ।যাহোক, শাস্ত্রের আলোকে বলি ,ব্রাহ্মণদের অশৌচ দশদিন, ক্ষত্রিয়র বার দিন, বৈশ্যের পনেরো দিন এবং শূদ্রের একমাস ।আর শাস্ত্রের আলোকে সিদ্ধান্ত নেবার ভার আপনাদের সর্বোচ্চ আদালত বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম ।সুদীর্ঘ লিখায় ভুল ভ্রান্তি র জন্য ক্ষমা প্রার্থী ।
 অশৌচের প্রয়োজনীতা কি?  শাস্ত্রীয় কিছু দিকনির্দেশ, 
স্মৃতোক্ত অশৌচ বিধি, অপূর্ব্ববিধির অন্তর্গত। বৈদিক সদাচারে স্মরণাতীত কাল হইতে, সনাতন সমাজে এই বিধি মর্য্যাদার সাথে আচরিত হয়। অপূর্ব্বতা বলেই, এই বিধি প্রশ্নাতীত-সংশয়াতীত মান্যতায় অঙ্গীকৃত। অন্যথায়, বিধির প্রযোজক কারন স্বীকৃত হলে, অপূর্ব্বতার হানি হয়। ইহা শাস্ত্রসিদ্ধান্ত।


সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রাকৃত লৌকিক যুক্তশীলতায়, এতদ্‌বিষয়ে কার্য্যকারন সম্পর্কের ব্যাখ্যায় স্বীকৃত প্রত্যক্ষ, অধিক হর্ষ-বিষাদজনিত কারনে অন্তঃকরন চঞ্চলতা প্রাপ্ত হয়। এই চঞ্চলতা বশতঃ ক্রিয়া-কর্ম্মাদিতে কাঙ্খিত একাগ্রতা-নৈপুন্যতা স্বাভাবিক ব্যহত হয়। তাৎক্ষণিক ভাবজাত প্রবৃত্তি, বৈদিক কর্ম্মানুষ্ঠানের নিয়ামক রূপে স্বীকৃত নয়। অতঃ শাস্ত্রীয় অনুশাসনে, সবিশেষ আনন্দ-শোক-উদ্বেগ জনিত মনবৈকল্য প্রশমনে বর্ণধর্মানুসার আত্মীকৃত শিক্ষাতারতম্যে, অশৌচ কালভেদ সূচীত হয়। অশৌচ কাল পরিমাপ প্রতীকি। ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রমীর পালনীয় দশাহ অশৌচ কাল, চতুর্বেদ ও ষড়বেদাঙ্গের সন্মিলিত শিক্ষার রূপকে গৃহীত। ব্রাহ্মণ শ্রৌতশিক্ষায় সাময়িক মানষিক হর্ষ-বিষাদাদি অবস্থা অতিক্রমন করে স্ববৃত্তিতে যথাযথ পুণঃস্থিতি প্রাপ্ত হয়। ক্ষত্রিয় বর্ণাশ্রমী আদিত্যধর্মী। আদিত্য যেরূপ দ্বাদশ রাশিচক্র অতিক্রমনান্তর সূচনাদশায় প্রত্যাবর্তন  করে, অনুরূপ, দ্বাদশাহ অশৌচান্তে ক্ষত্রিয় পুনঃ স্ববৃত্তিতে অধিকার লাভ করে। ধান্যাদি শষ্য যেরূপ ন্যুনাধিক পঞ্চদশ সপ্তাহে বীজ হতে বীজে পরিবর্তিত হয়, তদনুরূপ বৈশ্য বর্ণাশ্রমী পঞ্চদশাহ অশৌচান্তে পূর্ব্বাবস্থা প্রাপ্ত হয়। আর, যেহেতু শুদ্র বর্ণাশ্রমীর স্বাধীন বৃত্তি অস্বীকৃত, সেক্ষেত্রে মনবৃত্তির সাধারণ গতি চন্দ্রসাম্যে গৃহীত। চন্দ্র যেমন ত্রিশতিথিগত পক্ষাবর্তনে সূচনাতিথি প্রাপ্ত হয়, শুদ্র অনুরূপে ত্রিশাহ অশৌচান্তে স্ববৃত্তস্থতা প্রাপ্ত হয়।৷
৷৷৷৷৷৷৷৷৷  ৷ (লেখক শ্রী  মানিক চক্রবর্তী )৷৷৷৷৷৷  

Wednesday, February 8, 2017

বেদ হিন্দুদের প্রাচীনতম ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম। এর চারটি মূল অংশ রয়েছে: ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সাম বেদ এবং অথর্ব বেদ। বেদ (সংস্কৃত véda वेद " জ্ঞান ") প্রাচীন ভারতে লেখা হয়েছে। তারা সংস্কৃত সাহিত্যের পুরনোতম স্তর সংগঠিত করে হিন্দুধর্মের উপর।

এটি একটি ধর্মীয় গ্রন্থ হিন্দুদের। হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী, বেদ একটি মানবিক গ্রন্থ নয়। বৈদিক মন্ত্রগুলো হিন্দুদের অনুষ্ঠান, ধর্মীয় কাজ এবং অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজে পড়া হয়। ‘বেদ’ শব্দের বু্ৎপত্তিগত অর্থ জ্ঞান। যার অনুশীলনে ধর্মাদি চতুর্বর্গ লাভ হয় তা-ই বেদ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বেদকে অপৌরুষেয় অর্থাৎ ঈশ্বরের বাণী বলে মনে করা হয়। এটি কতগুলি মন্ত্র ও সূক্তের সংকলন। বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ প্রমুখ বৈদিক ঋষি জ্ঞানবলে ঈশ্বরের বাণীরূপ এসব মন্ত্র প্রত্যক্ষ করেন। তাই এঁদের বলা হয় মন্ত্রদ্রষ্টা। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলাও ছিলেন, যেমন বিশ্ববারা, লোপামুদ্রা প্রভৃতি।


উৎপত্তি ও ব্যবহারের রীতিনীতি

সংস্কৃত শব্দ véda " জ্ঞান" মূল বে- থেকে উৎপত্তি নির্ণয় করা হল " জানতে "। এটি চার বিধিসম্মত বেদের সঙ্গে সহযোগী (ঋগ্বেদ, যজু বেদ, সাম বেদ ও অথর্ব বেদ) যদিও তথ্যসূত্র অনুযায়ী এটি যুক্ত ছিলো ব্রাহ্মন, আর্য এবং উপনিষদের সাথে। বেদের এক নাম শ্রুতি। এর কারণ, লিপিবদ্ধ হওয়ার আগে দীর্ঘকাল বেদ ছিল মানুষের স্মৃতিতে বিধৃত



গুরুশিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি অর্থাৎ শ্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেদ আয়ত্ত করা হতো। যেহেতু শোনা বা শ্রুতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ঘটত তাই এ থেকে বেদের এক নাম হয় শ্রুতি। বেদকে ত্রয়ীও বলা হয়। এর কারণ, বেদের মন্ত্রগুলি আগে ছিল বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। ব্যাসদেব যজ্ঞে ব্যবহারের সুবিধার্থে মন্ত্রগুলিকে ঋক্, যজুঃ, সাম এই তিন খণ্ডে বিন্যস্ত করেন। তাই বেদের অপর নাম হয় সংহিতা। বেদ চারখানা হলেও চতুর্থ অথর্ববেদ অনেক পরবর্তীকালের রচনা এবং এর কিছু কিছু মন্ত্র প্রথম তিনটি থেকেই নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া যজ্ঞে এর ব্যবহার নেই। অবশ্য বেদকে ত্রয়ী বলার অন্য একটি কারণও আছে এবং তা হলো: এর মন্ত্রগুলি মিতত্ব, অমিতত্ব ও স্বরত্ব এই তিনটি স্বরলক্ষণ দ্বারা বিশেষায়িত, যার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রগুলিকে উপর্যুক্ত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।বেদের রচনাকাল সম্পর্কে অনেক মতভেদ আছে। এ নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্যও দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, বেদ রচনার শুরু থেকে তা সম্পূর্ণ হতে বহুকাল সময় লেগেছে। সেই কালসীমা মোটামুটিভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০-৯৫০ অব্দ পর্যন্ত ধরা হয়। :   

Tuesday, January 17, 2017

বেদ-বিহীন সনাতন ধর্ম্মচর্চ্চা ও
হালে আমাদের অবক্ষ
পুনঃশ্চ------ সত্যদর্শী ঋষিগণের মাধ্যমে
প্রতিভাত হওয়া বেদ জ্ঞান হিন্দু আইনশাস্ত্র
মতে নিত্য এবং অবশ্যপাঠ্য। ইতিহাসের সাক্ষ্য
কয়েক শতক আগেও বেদ জ্ঞান ছিল প্রতিটি
হিন্দুর প্রাত্যাহিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। যুগে
যুগে পারস্পরিক সময়ের বিবর্তনে, পার্থিব
প্রীতি, ধর্ম্মীয় অজ্ঞানতার করালগ্রাসে,
ঔপনিবেশিকদের ঘোর চক্রান্তে, তথাকথিত
ধর্মপ্রচারক ও ধর্মব্যবসায়ীদের অপপ্রচারে
বিভ্রান্ত হয়ে আমরা আজ মহান বেদ এর
আলোকিত পথ থেকে সরে পথহারা বিভ্রান্ত। এরই
ফল স্বরুপ আমরা আজ ধর্ম্মীয় জাতি হিসেবে এক
ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। জ্ঞানের অভাবে নিত্য
নৈমিত্তিক অন্য ধর্মালম্বীদের কাছে অপমানের
স্বীকার তো বটেই।
এই কলিযুগে সাধারন মানুষের পক্ষে বেদ পরা
সম্ভব নয় অথবা বেদ পরার পবিত্রতা মানুষের নেই
এরকম একটা কথা অনেকেই প্রচার করে থাকেন।
তারা আরও বলেন যে বেদবিহিত কর্মসমুহ
কলিযুগের মানুষের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। আসলেই
কি তাই?
প্রথমেই দেখি বেদ কি বলেছে-
" পুরো মহাবিশ্ব পাল্টে যেতে পারে, কিন্তু
মহাবিশ্বের সংবিধান "বেদ" সকল কালের জন্য
প্রযোজ্য যা সর্বদা অপরিবর্তিত থাকবে"
ঋগবেদ ১/৯০/২
বেদ সকল যুগ ও কালের জন্য প্রযোজ্য। এর বাণী
কখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়না, অচল হয়না।
"বেদ" মন্ত্র কলিযুগে নিষ্ক্রিয়-এ ধরনের প্রলাপ
তাই অনর্থক। সর্বযুগেই তা আধুনিক।
"অংতি সন্তং ন জহাত্যন্তি সন্তং ন পশ্যতি।
দেবস্য পশ্য কাব্যং ন মমার ন জীর্যতি।"
অথর্ববেদ ১০.৮.৩২
অর্থাৎ, মনুষ্য সমীপবর্ত্তী পরমাত্মাকে দেখে না
আবার, তাহাকে ছাড়িতেও পারেনা। পরমাত্মার
বানী বেদকে দেখ, কখনও অচল হয়না, কখনও
অপ্রাসঙ্গিক বা জীর্ন হয়না। মনিষীরা কি
বলেছেন একটু শুনি-
"বেদ হচ্ছে সকল সত্য জ্ঞানের উৎস। মহাকর্ষ
শক্তি যেমন তা আবিস্কারের আগেও বিদ্যমান
ছিল, তেমনি মানবজাতি যদি এটা ভুলেও যায়
তারপরও এটা অপরিবর্তিতভাবে বিদ্যমান
থাকবে।
ঠিক তেমনি বেদ" (স্বামী বিবেকানন্দ, Comp lete
work,vol paper on Hinduism) ও
Dayanand Saraswati - যিনি বেদের আধ্যাত্মিক
অনুবাদক, তিনি বলেছিলেন-
"বেদ হল একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা সকল যুগের জন্য
একেবারে সুবিধা জনক ভাবে প্রযোজ্য।"
যেখানে বেদ বলছে এটা সব যুগের জন্য প্রযোজ্য
সেখানে কতিপয় জ্ঞানপাপীর এহেন আচরন
সন্দেহজনক। এবার আমরা আসি বাস্তবিক যুক্তি
প্রয়োগে। ঈশ্বর হলেন ত্রিকালজ্ঞ অর্থাৎ- যিনি
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব জানেন। তাহলে
তার পক্ষে কেন সম্ভব হবেনা এমন কোন গ্রন্থ
প্রেরন করা যা সর্বযুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য?
তাছাড়া এসব অবান্তর যুক্তি যারা পেশ করেন
তারা নিজেরা কি কখনও বেদ পড়েছেন তাদের
কথার সত্যতা যাচাই এর জন্য? তাদের প্রতি
আহবান জানাচ্ছি, - পারলে বেদের এমন কোন
নিয়ম দেখান যা বর্তমান যুগের জন্য প্রযোজ্য নয়।
বরং এটা কলি যুগে আরও বেশি প্রয়োজন কারন
বেদের কর্মকান্ড প্রতিদিনের নিত্যকর্মাদি,
দর্শন, বিজ্ঞান, আইন, অর্থনীতি ও রাজনীতি
ব্যখ্যা করেছে যা সত্য যুগের তুলনায় কলি যুগেই
বেশী দরকার। আরেকটি প্রশ্ন করেন তারা -
বেদের বৃহৎ কলেবর নিয়ে যেটা সম্পূর্ন
ভিত্তিহীন। কারন বৈদিক যুগেও এমন খুব কম
লোকই ছিলেন যারা সবকটা বেদ জানতেন। কেউ
বা একটা, কেউ বা দুটা, কেউ তিনটা, কেউবা
চারটাই জানতেন - যাদের যথাক্রমে একবেদী,
দ্বিবেদী, ত্রিবেদী ও চতুর্বেদী বলা হত। তবে
ত্রিবেদী ও চতুর্বেদী ছিল হাতে গোনা।
একবেদী রা ই ছিল সর্ব্বোচ্চ। আর তাছাড়া কেউ
ই আমাদেরকে বেদ মুখস্ত করতে বলছেনা। আর এ
ধরনের প্রচারকারীদের মধ্যে অনেকেই বলেন
"শ্রীমদভাগবত" পড়ার কথা! এখন আপনারা ই বলুন,
যেখানে যজুর্বেদ এর মন্ত্রসংখ্যা ২০০০ সেখানে
এর বদলে এর কয়েকগুন বড় একটা পুরান কলেবরের
দোহাই দিয়ে পরতে বলাটা কতটুকু যৌক্তিক?
আশাকরি আপনারাই ভাল বুঝবেন।
অনেকেই বলেন বেদপাঠ করার মত পবিত্রতা
কলিযুগের মানুষের নেই। কথাটা যে কি পরিমান
ভিত্তিহীন তা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়।
প্রথমেই আসি হিন্দু আইনশাস্ত্র "মনুসংহিতা"
তে।
মনুসংহিতা ১/৮৫
"চারযুগে(সত্য,ত্রেতা, দ্বাপর,কলি) দায়িত্বের
রকমভেদ রয়েছে কারন প্রতি যুগে মানুষের আয়ু
হ্রাস পাচ্ছে"
১/৮৬- "সত্য যুগে ধ্যন ত্রেতায় জ্ঞান দ্বাপর এ
যজ্ঞাদি ও কলিতে মোক্ষ।(হরিনাম এর একমাত্র
উপায় এ কথা কোথাও বলা হয়নি। হরিনাম খুব ই
পবিত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু শুধু হরিনাম করলেই
মোক্ষ লাভ হয়না)
১/৮৭- কিন্তু মহাবিশ্বের ভারসাম্য রক্ষার্থে
সবসময় ই চার ধরনের পেশা ভাগ করা হয়েছে।
১/৮৮- ব্রাক্ষ্মনরা নিজ স্বার্থত্যগ করে কাজ
করবে,বেদ পরবে এবং তা অপরকে শেখাবে।
১/৮৯ - ক্ষত্রিয়রা বেদ জ্ঞান লাভ করবে ,
লোকরক্ষা ও রাজ্য পরিচালনায় নিযুক্ত থাকবে।
১/৯০ -"বৈশ্যরা বেদ অনুসৃত কার্যঃ ব্যবসা ও
কৃষিকর্মে নিজেদের নিযুক্ত করবে।
১/৯১ - শুদ্ররা বেদ অনুসৃত কাজ করবে এবং
সেবামুলক কর্মকান্ডে নিযুক্ত থাকবে।
তাহলে কি স্পষ্ট হল? প্রতিযুগে কর্তব্য পালটাবে
ঠিক তবে "বেদ" জ্ঞান সর্বযুগেই আবশ্যক। আর
যারা বেদনিসৃত পবিত্রতা ও কর্মের অযোগ্য তার
হরিনাম যা সবচেয়ে পবিত্র তা নেয়ার পবিত্রতা
থাকবে কি করে ? সবচেয়ে খারাপ,অপবিত্র
লোকটিও নিজেকে বেদ নির্ভর এর কর্মকান্ডের
মাধ্যমে জ্ঞানালোকে পরিপুর্ন করতে পারে।
তাই তো সর্ব্ব দ্রষ্টা ও জ্ঞাতা ঋষি গণ কর্তৃক
শ্রোত পবিত্র "বেদ"এর ভাষায় ঘোষণা করা
হয়েছে---
"আমি মানব কল্যাণে যে বাণী তোমাদের
দিয়েছি তা প্রচার কর-
"ব্রাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শুদ্র নারী পুরুষ পাপী
পুন্যাত্মা নির্বিশেষে সকলকে।" যজুর্বেদ ২৬/২।।

!! হে ঈশ্বর, সকলের মঙ্গল করুন !!

ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
                                             

চার বর্ণের অশৌচ ব্যবস্থা নিয়ে শাস্ত্রীয় রেফারেন্স

চার বর্ণেরঅশৌচ ব্যবস্থাঃ
  
চার বর্ণের অশৌচ ব্যবস্থা
চার বর্ণের অশৌচ ব্যবস্থা  


বর্তমান সময়ে “সর্ববর্ণে দশাহ অশৌচ” পালন নিয়ে একটা বিতর্ক সব জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে ।অশৌচ কাল সর্ববর্ণের জন্য দশদিন না যুগ যুগ ধরে বর্ণ অনুসারে দশ,বার,পনের ও ত্রিশ দিন হবে তা নিয়ে আমাদের অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে ।কোন কোন পন্ডিত অভিমত দিচ্ছেন যে, সর্ববর্ণে দশাহ অশৌচই শাস্ত্র সিদ্ধান্ত ,যদিও অধিকাংশ পন্ডিত তার বিরোধিতা করছেন। এতে সাধারন মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।সমাজ দর্পণ পত্রিকা কয়েক বছর ধরে জোরালোভাবে এ সম্পর্কে নিয়মিত প্রচার চালাচ্ছে এবং এটা যে শাস্ত্রসম্মত তা প্রমাণের জন্য কিছু শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রবন্ধও প্রকাশ করেছে।আমি সমাজ দর্পণের একজন নিয়মিত পাঠক।বর্তমান সময়ে সনাতন কৃষ্টির প্রচারে সমাজ দর্পণ বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে।কিন্ত “সর্ববর্ণে দশাহ অশৌচ পালন” বিষয়ে সমাজ দর্পণের প্রচারের বিষয়ে আমার মতামত ব্যক্ত করতেই এই লেখা।আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করছি এবং অশৌচ বিষয়ে সনাতন শাস্ত্রের অভিমত প্রকাশের জন্য এ প্রবন্ধ লিখছি।
সকলের জন্য ১০ দিনেই অশৌচ বিধান এবং ১১ দিনে শ্রাদ্ধ করার বিধান দিতে গিয়ে সমাজ দর্পণে সর্বমোট তিনটি শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়েছে।সেগুলো হলোঃ
১)মনুসংহিতার উদ্ধৃতিঃ দশাহং শাবমাশৌচং সপিন্ডেষু বিধীয়তে |
অর্বাক সঞ্চয়নাদস্থাং ত্রহেমেকাহমেব চ ||(মনুসংহিতা ৫|৫৯)
অর্থঃ সপিন্ডের মৃত্যু হলে দশাহ(দশদিন)অশৌচ হবে এবং গুণের তারতম্য অনুসারে চারদিন অথবা তিনদিন অথবা এক অহোরাত্র মাত্র অশৌচ বিহিত।
২)গরুড় পুরাণের উদ্ধৃতিঃ একাদশায়ে প্রেতস্য যস্যোৎ সৃজ্যোত নো বৃষ |
প্রেতত্বং সুস্থিতং তস্য দত্তৈ শ্রাদ্ধশতৈরপি ||(গরুড় পুরাণ,উত্তরখন্ড ৬|৪০)
অর্থঃ যে প্রতের উদ্দেশ্যে একাদশাহে বৃষোৎসর্গ না হয় তাহার উদ্দেশ্যে শত শত শ্রাদ্ধ করলেও তার প্রতত্ব বিমুক্ত হয় না।
৩)বরাহ পুরাণের উদ্ধৃতিঃ ‘দশাহং শাবমাশৌচং সপিন্ডেষু বিধীয়তে
জননেহপ্যেমেব সান্নিপুনং শুদ্ধি মিচ্ছাতাম ||(বরাহ পুরাণ ১৮৮|১-৭)
অর্থঃ ‘একাদশ দিনে যথাবিধি একোদ্দিষ্ট বিধিক পিন্ড দান করিবে।মনুষ্যগণের মধ্যে বিপ্র,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য বা শূদ্র এই চারিবর্ণের একোদ্দিষ্ট বিধি একরূপ।
পাঠক একটু খেয়াল করে দেখুন উপরোক্ত শ্লোকগুলির কোথাও স্পষ্ট এবং সরাসরি বলা নেই যে, “সর্ববর্ণে দশাহ অশৌচ হইবে”!!!!!
আরেকটা মজার ব্যপার হলো বরাহ পুরাণের যে শ্লোকটি(১৮৮|১-৭) দেয়া হয়েছে তার সংস্কৃত শ্লোকের সাথে বাংলা অর্থের(যা দেয়া হয়েছে) মিল নাই এবং ঐরূপ কোন শ্লোক বরাহ পুরাণে নেই!! তবে যে বাংলা অর্থ দেয়া হয়েছে তা বরাহ পুরাণে আছে এভাবেঃ
একাদশে চ দিবসে একোদ্দষ্ট যথাবিধি
………………………………………………..
একোদ্দিষ্টং মনুষ্যাণাং চাতুর্বর্ণস্য মাধবি বরাহ পুরাণ (১৮৮|৫,৭)
দেখা গেল একটি শ্লোকের প্রথম লাইন এবং তার পরের আরেকটি শ্লোকের আরেক লাইন নিয়ে সমাজ দর্পণে প্রকাশিত হয়েছে।কাজেই এটার বিষয় পাঠককুল বিবেচনা করুন।
এবার দেখা যাক অশৌচ কাল বিষয়ে সনাতন শাস্ত্রে স্পষ্ট এবং সরাসরিভাবে কি বলা হয়েছেঃ
|| মনু সংহিতার বিধান ||
শুধ্যেদ্বিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (মনুসংহিতা ৫|৮৩)
অর্থঃ ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
|| অত্রি সংহিতা ||
ব্রাহ্মণো দশরাত্রেণ দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (অত্রি সংহিতা,৮৫ নং শ্লোক)
অর্থঃ ব্রাহ্মণ দশদিনের পর,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিনের পর,বৈশ্য পঞ্চদশ দিনের পর ও শূদ্র একমাসের পর শুদ্ধ হয়।
|| বিষ্ণু সংহিতা ||
ব্রাহ্মণস্য সপিন্ডানাং জননমরণয়োর্দ্দশাহমাশৌচম ||
দ্বাদশাহং রাজন্যস্য || মাস শূদ্রস্য || (বিষ্ণু সংহিতা ২২|১-৩)
অর্থঃ সপিন্ডদিগের জন্ম মরণে ব্রাহ্মণের দশদিন,ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশাহ,বৈশ্যের পঞ্চদশাহ এবং শূদ্রের একমাস অশৌচ কাল।
|| যাজ্ঞবাল্ক্য সংহিতা ||
ক্ষত্রস্য দ্বাদশাহানি বিশঃ পষ্ণদশৈব তু |
ত্রিংশদ্দিনানি শূদ্রস্য তদর্দ্ধং ন্যায়বর্ত্তিনঃ || (যাজ্ঞবাল্ক্য সংহিতা ৩|২২)
অর্থঃ ক্ষত্রিয়ের পূর্ণাশৌচ বার দিন,বৈশ্যের পনের দিন এবং শূদ্রের একমাস।
|| উশনঃ সংহিতা ||
শুধ্যেদ্বিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূপতিঃ |
বৈশ্য পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (উশনঃ সংহিতা ৬|৩৪)
অর্থঃ ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
|| অঙ্গিরা সংহিতা ||
দশাহাচ্ছুধ্যতে বিপ্রো দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
পাক্ষিকং বৈশ্য এবাহ শূদ্র মাসেন শুধ্যতি || (অঙ্গিরা সংহিতা ৫১ নং শ্লোক)
অর্থঃ ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
|| সংবর্ত্ত সংহিতা ||
বিপ্রো দশহমাসীত দানধ্যায়নবর্জ্জিতঃ |
ক্ষত্রিয় দ্বাদশাহেন বৈশ্য পঞ্চদশৈব তু ||
শূদ্রঃ শুধ্যতি মাসেন সাংবর্ত্তবচং যথা || (সংবর্ত্ত সংহিতা ৩৮ নং শ্লোক)
অর্থঃ জনন বা মরণে ব্রাহ্মণ দান অধ্যয়ণ বর্জ্জনপূর্বক,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হইবে;ইহাই সংবর্ত্ত মুনির অনুজ্ঞা জানিবে।
|| পরাশর সংহিতা ||
জাতো বিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (পরাশর সংহিতা ৩|৪)
অর্থঃ জনন বা মরণ হইলে ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
|| শঙ্খ সংহিতা ||
সপিন্ডতা তু পুরুষে সপ্তমে বিনিবর্ত্ততে |
জননে মরণে বিপ্রো দশাহেন বিশুধ্যতি ||
ক্ষত্রিয় দ্বাদশাহেন বৈশ্য পক্ষেণ শুদ্ধতি |
মাসেন তু তথা শূদ্রঃ শুদ্ধিমাপ্নোতি নান্তরা || (শঙ্খ সংহিতা ১৫|২-৩)
অর্থঃ সপিন্ড জ্ঞাতির জননে বা মরণে ব্রাহ্মণ দশাহ অশৌচ ভোগ করিয়া শুদ্ধ হয়;ক্ষত্রিয় দ্বাদশাহ;বৈশ্য পঞ্চদশাহ এবং শূদ্র একমাস অশৌচ ভোগ করিয়া শুদ্ধ হয়।
|| দক্ষ সংহিতা ||
জাতিবিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (দক্ষ সংহিতা ৬|৭)
অর্থঃ জনন বা মরণ হইলে ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
|| গৌতম সংহিতা ||
……… ক্ষত্রিয়স্য দ্বাদশ রাত্রং বৈশ্যস্যার্দ্ধমাসমেকং শূদ্রস্য ||গৌতম সংহিতা ১৪ অধ্যায়)
অর্থঃ ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশ রাত্র;বৈশ্যের পঞ্চদশ এবং শূদ্রের একমাস অশৌচ হয়।
|| কূর্ম্ম পুরাণ ||
শুধ্যেদ্বিপ্রো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (কূর্ম্ম পুরাণ,উপরিভাগ ২৩|৩৮)
অর্থঃ ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
|| লিঙ্গ পুরাণ ||
অনন্তর ব্রাহ্মণের দশাহে শুদ্ধি হয়………….।ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশ দিন সম্পূর্ণাশৌচ……….
………।………বৈশ্যের পঞ্চদশ দিনে ও শূদ্রের একমাস সম্পূর্ণাশৌচ।(লিঙ্গ পুরাণ,পূর্বভাগ ৮৯ অধ্যায়)
|| মার্কন্ডেয় পুরাণ ||
দশাহং ব্রাহ্মণস্তিষ্ঠেদ্দানহোমাদিবর্জ্জিতঃ |
ক্ষত্রিয় দ্বাদশাহঞ্চ বৈশ্য মাসার্দ্ধমেব চ ||
শূদ্রস্ত্ত মাসামাসীত নিজকর্ম্মবিবর্জ্জিত |
ততঃ পরং নিজ কর্ম্ম কুর্য্যুঃ সর্ব্বে যথেস্পিতম ||(মার্কন্ডেয় পুরাণ ৩৫|৪০,৪১)
অর্থঃ জননাশৌচ ও মরণাশৌচে বিপ্রগণ দশদিন যাবৎ দান হোমাদি নিজ কর্ম্ম-বর্জ্জিত অবস্থিতি করিবেন এবং ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্যেরা পঞ্চদশ দিন ও শূদ্রগণ একমাস যাবৎ ঐ রূপ আচরণে থাকিবে।তৎপরে সকলেই শাস্ত্রোক্ত বিধানে স্ব স্ব কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিবে।
## এ সম্পর্কে আরো বলা আছেঃ
দশদ্বাদশমাসার্দ্ধ-মাসসংখৈর্দিনৈগতৈঃ |
স্বাঃ স্বাঃ কর্ম্মক্রিয়াঃ কুর্য্যুঃ সর্বে বর্ণা যথাবিধি || (মার্কন্ডেয় পুরাণ ৩৫|৫১)
অর্থঃ ব্রাহ্মণাদি যাবতীয় বর্ণই বিধান অনুসারে দশদিন,দ্বাদশদিন,পক্ষ ও একমাস অবলম্বন পূর্বক নিজ নিজ বর্ণ বিহিত কার্য্যাদি সমাধা করিবে।
|| বিষ্ণু পুরাণ ||


বিপ্রস্যৈতদ্ দ্বাদশাহং রাজন্যস্যপ্যশৌচকম্ |
অর্দ্ধমাসশ্চ বৈশ্যস্য মাসঃ শূদ্রস্য শুদ্ধয়ে || (বিষ্ণু পুরাণ,তৃতীয়াংশ ১৩|১৯)
অর্থঃ ব্রাহ্মণের অশৌচ দশদিন,ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশ,বৈশ্যের পঞ্চদশ এবং শূদ্রের অশৌচ একমাস।
পাঠককুল এবার আসুন গরুড় পুরাণে।দেখা যাক গরুড় পুরাণ কি বলে।
|| গরুড় পুরাণ ||
সোজাভাবে বলছেঃ শুচির্বিপ্রো দশাহেন ক্ষত্রিয় দ্বাদশাহত |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || (গরুড় পুরাণ,পূর্ব্বখন্ড ২২৬|৩৮)
অর্থঃ জননাশৌচ ও মরণাশৌচ উপস্থিত হইলে ব্রাহ্মণ দশদিন,ক্ষত্রিয় দ্বাদশ দিন,বৈশ্য পঞ্চদশদিন এবং শূদ্রর ত্রিশ দিনে শুদ্ধ হয়।
আবার বলছেঃ
জাতিবিপ্রো দশহাত্তু ক্ষত্রো দ্বাদশকাদ্ দিনাৎ |
পঞ্চদশাহাদ্বৈশ্যস্ত্তু শূদ্র মাসেন শুধ্যতি || (গরুড় পুরাণ,পূর্ব্বখন্ড ১০৭|১১)
অর্থঃ যিনি জাতি মাত্রে বিপ্র তিনি দশদিন,যিনি জাতি মাত্রে ক্ষত্রিয় তিনি দ্বাদশ,যিনি জাতি মাত্রে বৈশ্য পঞ্চদশ এবং যিনি জাতি মাত্রে শূদ্র তিনি একমাসে শুদ্ধ হন।
আরো দেখুনঃ
দশাহং প্রাহুরাশৌচং সপিন্ডেষু বিপশ্চিতঃ |
মৃতেষু বাথ জাতেষু ব্রাহ্মণানাং দ্বিজোত্তমা ||
ক্ষত্রিয়ো দ্বাদশাহেন দশভিঃ পঞ্চভভির্বিশঃ |
শুধ্যেন্মাসেন বৈ শূদ্রো যতীনাং নাস্তি পাতকম্ || (গরুড় পুরাণ,পূর্ব্বখন্ড ৫০|৮১,৮৩)
অর্থঃ ব্রাহ্মণের জন্ম-মরণে জ্ঞাতিবর্গের দশাহ অশৌচ হয়।প্রাচীন পন্ডিতগণ ইহা বলিয়া থাকেন।ক্ষত্রিয়ের জন্ম-মরণে জ্ঞাতিবর্গের দ্বাদশাহে;বৈশ্যের পঞ্চদশাহ ও শূদ্রের একমাস অশৌচ হয়।
|| পদ্ম পুরাণ ||
দশাহং শাবমাশৌচং ব্রাহ্মণস্য বিধিয়তে |
ক্ষত্রিয়েষু দশ দ্বে চ পক্ষং বৈশ্যেষু চৈব হি ||
শূদ্রেষু মাসামাশৌচং সপিন্ডেষু বিধিয়তে || (পদ্ম পুরাণ,সৃষ্টি খন্ড ১০|২,৩)
অর্থঃ শাবাশৌচ ব্রাহ্মণের অশৌচ দশদিন;ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশদিন;বৈশ্যের পঞ্চদশ এবং শূদ্রের একমাস হইবে।
|| ব্রহ্ম পুরাণ ||
দশাহং ব্রাহ্মণস্তিষ্ঠেদ্দানহোমবিবর্জ্জিতঃ |
ক্ষত্রিয়ো দ্বাদশাহঞ্চ বৈশ্য মাসার্দ্ধমেব চ ||
শূদ্রশ্চ মাসামাসীত নিজকর্ম্মবিবর্জ্জিত || (ব্রহ্ম পুরাণ ২২১|১৪৭,১৪৮)
অর্থঃ জন্ম ও মরণ উপলক্ষে ব্রাহ্মণ দশদিন;ক্ষত্রিয় দ্বাদশদিন;বৈশ্য মাসার্দ্ধ যাবৎ দান হোম বর্জ্জনপূর্ব্বক থাকিবে।শূদ্র একমাস নিজ কর্তব্য বর্জ্জন করিবে।
|| অগ্নি পুরাণ ||
দশা হাচ্ছদ্ধ্যতে বিপ্রো দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ |
বৈশ্যঃ পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যতি || ( অগ্নি পুরাণ ১৫৮|১২ )
এরকম আরো বহু শ্লোক উদ্ধৃত করে অশৌচকাল সম্পর্কে ঋষিগণের কি অভিমত তা সুস্পষ্টভাবে দেখানো সম্ভব।পূর্বেই উল্লেখ করেছি সনাতন শাস্ত্রের কোথাও বলা নেই “সর্ববর্ণে দশাহ অশৌচ হইবে”।সমাজ দর্পণে যে ৩ টি শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়েছে তাতেও সরাসরি এমন কথা বলা হয় নাই।এবং আমি দেখিয়েছি মনু সংহিতায় এবং গরুড় পুরাণে কিভাবে অশৌচ বিধি বলা হয়েছে।কাজেই বর্ণভেদে অশৌচকালের পার্থক্য হয় এটাই শাস্ত্র সিদ্ধান্ত।আর আমরা বিশ্বাস করি ঋষিপ্রণিত বিধান মানাই সর্বৈব বিধেয়।আর তা না করে কেউ নিজেদের খেয়াল মতো চললে তা অনুসরণ না করাই শ্রেয়।লেখার শিরোনামটার জবাব এবার আপনারাই বিচার করুন।ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন।                
                         

Saturday, January 14, 2017

দশসংস্কার কি এবং কেনো করা হয়।

আসুন দশসংস্কার নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক,মনুসংহিতা, যাজ্ঞবাল্ক সংহিতা পরাশর সংহিতা, ইত্যাদি প্রভূতি স্মৃতিশাস্ত্রেদশকর্মের অনেক বিধি-বিধান বর্ণিত রয়েছে। প্রথমে গর্ভাধান নিয়ে আলোচনা করি,•গর্ভাধান হল যে,পিতা-মাতার দেহে ও মনে যেসব দোষ- গুণ থাকে সেগুলো সন্তানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। এটা দেখে আর্য- ঋষিগণ গর্ভাধান বিধি প্রবর্তন করেছেন। শুভলগ্নে সন্তানের জন্মদানের জন্য যে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান তাকে গর্ভাধান।•পুংসবন-পুত্র সন্তানের কামনায় যে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয়, তাকে পুংসবন বলে।•সীমন্তোন্নয়ন-গর্ভাবস্থার অন্যতম সংস্কার সীমন্তোন্নয়ন। গর্ভধারনের পর চতুর্থ, ষষ্ঠ বা অষ্টম মাসে এই সংস্কার করা হয়।•জাতকর্ম-সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র এ সংস্কার করতে হয়।এ সংস্কার কার্য হল-পিতা প্রথমত পুত্রকে স্বর্ণ দিয়ে পুত্রের মুখে মধু ও ঘৃত দেন এবং তার সাথে মন্ত্রোচ্চারণ করেন।•নামকরণ-সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার দশম,একাদশ, দ্বাদশ বা শততম দিবসে নামকরণ করতে হয়।শৈশব সংস্কারের প্রথম সংস্কার সন্তানের নাম রাখার অনুষ্ঠানই নামকরণ সংস্কার।•

অন্নপ্রাশন-পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে যষ্ঠ অষ্টম মাসে এবং কন্যা সন্তানের জন্ম থেকে পঞ্চম বা সপ্তম মাসে প্রথম ভোজন করার জন্য যে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয় তাকে অন্নপ্রাশন বলে।•চূড়াকরণ-গর্ভাবস্থায় সন্তানের মস্তকে যে কেশ উৎপন্ন হয়, তা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানসহ মুণ্ডনের নাম চূড়াকরণ।•উপনয়ন-উপনয়ণ সংস্কারে বিদ্যা শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীকে প্রথম গুরুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয় ‘উপনয়ন’ শব্দটির মানেই নিকটে নিয়ে যাওয়া। প্রচলিত একটি অর্থে উপনয়ন বলতে বোঝায় যজ্ঞপৌত বা পৈতা ধারণ।•সমাবর্তন-অধ্যায়ন শেষে গুরু কর্তৃক শিষ্যকে গৃহে ফেরার অনুমতি প্রদান উৎসবকে সমাবর্তন বলে। উপনয়ন শেষে গুরুগৃহে বাস করাই ছিল রীতি। সেখানে পড়াশুনা শেষ করে গুরুর অনুমতি নিয়ে গৃহে প্রত্যাগমন করতে হত। বর্তমানকালে সাধারণত গুরুগৃহে থেকে বিদ্যা বিদ্যাশিক্ষার প্রচলন নেই। সে কারণে এ সংস্কারটি এখন পালিত হয় না। তবে বর্তমানে ‘সমাবর্তন’ নামটি আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র বিতরণ উৎসব এখন সমাবর্তন উৎসব নামে উদযাপিত হয়।যারা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের উপাধি পত্র প্রদান উৎসবই পূর্বকালের গুরুগৃহ ত্যাগের উৎসব বলে মনে করা যেতে পারে।•বিবাহ-যৌবন অবস্থার সংস্কার বিবাহ সংস্কার বিবাহ। বিবাহের দ্বারা পুরুষ সন্তানের পিতা হন। নারী হন মাতা । বিবাহের মাধ্যমে পিতা, মাতা, পুত্র কন্যা প্রভূতি নিয়ে গড়ে ওঠে একটি পরিবার। পরিবারে সকলে মিলেমিশে সুখ-দুঃখ ভাগ ও ভোগ করে জীবন-যাপন করে। বিবাহে যেমন কতকগুলো শাস্ত্রীয়বিধি বিধান পালিত হয়, তেমনি পালিত হয় কতগুলো লৌকিক ও স্থানীয় স্ত্রী- আচার। বিবাহ উচ্চারণ করা হয় :-যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম।যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।।অর্থাৎ তোমার হৃদয় আমার হোক আমার হৃদয় তোমার হোক। এ মন্ত্রের মধ্য দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে গভীর ঐক্য গড়ে ওঠে। মনুসিংহতায় সেকালের অবস্থা অনুসারে ৮ রকমের বিবাহ- পদ্ধতির বর্ণনা আছে। যথা- ব্রাহ্ম, দৈব্য, আর্ষ, প্রজাপাত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ।কন্যাকে বিশেষ বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করে স্বর্ণ অলংকার ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত করে বিদ্বান ও সদাচর সম্পন্ন বরকে স্বয়ং আমন্ত্রন করে যে কন্যা দান করা হয় তাকে ব্রাহ্মবিবাহ বলে। “তোমরা উভয়ে সুখে গার্হস্থ্য ধর্মের আচরণ কর”- এই আর্শীবাদ করে যথাবিধি অলংকার ইত্যাদি দ্বারা অর্চনাপূর্বক বরকে যে কন্যা দান করা হয় তাকে প্রজাপত্য বিবাহ বলে।বিবাহের নানা প্রকার পদ্ধতি সেকালের সামাজিক প্রথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিবাহ- পদ্ধতি সমূহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহ পদ্ধতিটিই শ্রেষ্ঠ।


                                     ইতি    
                            মানিক চক্রবর্তী
          মোবাইল নং ০১৭৩৫৬৫১৫৯৭..

Ekadoshi

তর্পণ বিধি

 আমি প্রথমেই মহালয়া বিষয়ে দু'একটা কথা বলে নিই, তারপর  তর্পণ নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।  মহালয়া মানে শুধু মায়ের আগমন নয়, মহাল...

চারবর্ণের অশৌচ ব্যবস্তা