Monday, December 7, 2020

নিরাকার ঈশ্বরের মাঝে মাঝেও সাকারের প্রকাশঃ

 নিরাকার ঈশ্বরের মাঝে মাঝেও সাকারের প্রকাশঃ 

নিরাকার ঈশ্বরের বর্ণনা দিতে যেয়ে ভক্তগণ পবিত্র গীতার ৯|৪নং শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন ।এ শ্লোকের মধ্যে ও যে সাকার রূপের কথা আছে এই বিষয়ে আলোকপাত করবো।বলা হয়েছে, "ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্তমূর্তিনা।"সরলার্থ হলো, " সমস্ত জগতে আমি অব্যক্তরূপে পরিব্যাপ্ত আছি (৯|৪)।"

সারবত্তা হলো , মন- বুদ্ধি- ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যে জ্ঞান হয়,তা হলো ভগবানের ব্যক্ত রূপ ।আর যা মন- বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ের গোচর নয় অর্থাৎ মন ইত্যাদি যাকে জানতে পারে না, তাহলো ভগবানের অব্যক্ত রূপ ।

ভগবান উপরোক্ত শ্লোকে ' ময়া ' পদের দ্বারা ব্যক্ত( সাকার) স্বরূপ এবং ' অব্যক্তমূর্তিনা ' পদের দ্বারা অব্যক্ত ( নিরাকার) স্বরূপ সম্বন্ধে বলেছেন ।ময়া মানে আমা দ্বারা এবং অব্যক্তমূর্তিনা মানে অব্যক্ত মূর্তি তথা ইন্দ্রিয়ের অগোচর বুঝানো হয়েছে ।অব্যক্ত শব্দের সাথে মূর্তি শব্দটি সংযোজিত ।এর তাৎপর্য হলো, ভগবান ব্যক্ত ও অব্যক্ত উভয় রূপেই বিরাজিত।এভাবে এখানে ভগবানের ব্যক্ত- অব্যক্ত ( সাকার- নিরাকার) বলার গূঢ় তাৎপর্য হলো সমগ্র রূপের বর্ণনায় অর্থাৎ সগুণ- নির্গুণ, সাকার- নিরাকার ইত্যাদির প্রভেদ তো সম্প্রদায়গুলিতে হয় ,পরমাত্মা প্রকৃতপক্ষে এক ।সগুণ- নির্গুণ একই পরমাত্মার পৃথক্ পৃথক্ বিশেষ গুণ বা বিশেষণ ,ভিন্ন ভিন্ন নাম এবং সাকার- নিরাকার একই পরমাত্মার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ ।

এমতাবস্থায়, সাকারবাদীরা যেমন নিরাকারবাদীর সমালোচনা করে না,নিরাকারবাদীর ও উচিত সাকার বাদীদের সমালোচনা না করা।তবে কারো খটকা লাগলে প্রশ্ন করা বা জানতে চাওয়া দোষেরকিছু নয়।তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ঈশ্বরের সাকারত্ব ও নিরাকারত্ব নিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলে ও সনাতনীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্তব্য পাওয়া যায় না।বরং অন্য ধর্মের দু একজন  ফেইসবুক বন্ধু জানা ও বুঝার মানসে আমার লিখা পড়ে প্রশ্ন করেন যা ভালো লাগে ।অনেক সময় লিখতে মন চায় না।কারণ অনেকেই মনে মনে ভাবেন করুণাময় চক্রবর্তীর চেয়ে তো আমাদের অনেক জ্ঞান আছে, তার লিখা পড়ে কি জানতে পারবো, বুঝতে পারবো।আমি তাদেরকে বিনয়ের সহিত বলি, আমার নিজের কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেই,জ্ঞান ও নেই । তবে আমার সংগ্রহ করার অদম্য ইচ্ছা অনেকের চেয়ে বেশি ।

যাহোক, ঈশ্বরের সাকারত্ব ও নিরাকারত্ব নিয়ে আমাদের সনাতন ধর্মের লোকদের মধ্যে মত পার্থক্য বিদ্যমান ।সুতরাং আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। 

পিতৃ প্রেম

 পিতৃ প্রেম

"""""""""

-শ্রী পবিত্র কুমার চক্রবর্ত্তী

""""""""""""""""""""""""""

পিতা সম বন্ধু নাই

এই ভব মাঝে,

পিতা সম প্রিয় কেবা

পাশে রয় কাজে।


বিনা মূল্যে পিতা দেয়

গিরি সম টাকা,

যন্ত্র সম গৃহে মাঝে

ঘুরে যেন চাকা।


রাত দিন কষ্ট করে

পুত্র কন্যা লাগি,

নিজ দেহে জীর্ণ বস্ত্র

সর্ব সুখ ত্যাগী।


শত  ব্যাথা পেয়ে তবু

মুখে রেখে হাসি,

সর্ব কর্ম করে যায়

সবে ভাল বাসি।


পুত্র কন্যা শিখে যেন

বেশি লেখা পড়া,

ধন্য হবে ভব মাঝে

সব মাঝে সেরা।


কত স্বপ্ন থাকে তাঁর

দুটি আঁখি জুড়ে,

মন মাঝে গাঁথা আশা

আসে ঘুরে ঘুরে।


দেব সম সেই পিতা

থাকে গৃহ কোনে,

হৃদে রেখে প্রেম ভাব

পুত্র কন্যা সনে।


পিতা সনে পুত্র কন্যা

থেকে রাত্র দিনে,

দেব তুল্য জ্ঞান করে

চল তাঁর সনে।


পিতা সম গুরু নাই

এই বিশ্ব মাঝে,

কষ্ট কালে পাবে তুমি

ডাক দিলে কাজে।


এই মত পিতৃ প্রেম 

কেবা দিবে ভবে,

ভেবে দেখ এক‌ মনে

পুত্র কন্যা সবে?

ভগবানের সাকার রূপের প্রমাণ,

 ভগবানের সাকার রূপের প্রমাণঃ(১ম পর্ব)

আমরা সকলেই সাকার অর্থাৎ আমাদের রূপ রয়েছে ।আমাদের পিতারও রূপ ছিল, আমাদের পিতার পিতারও রূপ ছিল ।মানব জাতির পিতা মনুরও রূপ ছিল ।সকলের পিতা হলেন ঈশ্বর ।তাহলে তাঁর রূপ থাকবে না কেন? অবশ্যই তাঁর ও  রূপ আছে ।তাইতো তিনি সাকার । ঋগ্বেদে পরমেশ্বরের গুণবাচক শব্দ বিষ্ণুকে জগতের সকলের স্বামী তথা প্রভু ও পালনকর্তারূপে উল্লেখ করা হয়েছে ।বলা হয়েছে, "আমরা সকলের স্বামী, পালনকর্তা, শত্রুরহিত ও সেচন সমর্থ বিষ্ণুর পৌরুষের স্তুতি করি ।তিনি প্রশংসনীয় লোক রক্ষার ত্রিসংখ্যক পদবিক্ষেপের দ্বারা পার্থিব লোক সকল বিস্তীর্ণরূপে পরিক্রম করেছিলেন ( খগ্বেদ-১| ১৫৫|৪)।।" বিষ্ণুর অবয়ব বিষয়ে ঋগ্বেদে বর্ণনা করা হয়েছে ।বলা হয়েছে, " বিষ্ণু বৃহৎ শরীর বিশিষ্ট ও স্তুতি দ্বারা অপরিমেয়, তিনি নিত্য তরুণ ও অকুমার, তিনি আহবে গমন করেন ১|১৫৫|৬)।।"এখানে পরিষ্কার যে ঈশ্বর সাকার এবং তিনি এক।দেবতা বহু ।দেবতা হলেন ঈশ্বরের এক একটি শক্তি ।দেবতাদের নির্দিষ্ট আকার আছে যা মুনিঋষিগণ ধ্যানের মাধ্যমে পেয়েছেন ।ঈশ্বরের নির্দিষ্ট আকার নেই ।তাঁর রূপের তুলনা নেই ।তবে ঈশ্বরের অবতার ঈশ্বরের  এক একটি রূপ বলে তাঁদেরকে ভগবানরূপে উপাসনা করা হয়।

Saturday, December 5, 2020

ব্রাহ্মণদের ঐক্য গড়ে তোলা কি অসম্ভব!

 বাঙালী ব্রাহ্মণদের ঐক্য গড়ে তোলা কি সম্ভব নয়! ******************************************* 

 হ্যাঁ সম্ভব কেবলমাত্র আত্ম-সমালোচনার মাধ্যমে.

★আজকে প্রথম পর্ব★

আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে ব্রাহ্মণ বর্ণসম্প্রদায়ের সিংহভাগ লোকই অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দিতে পারিতো নাই-ই বরং তার থেকেও বড় কথা হলো কোন ব্যক্তি বিশেষকে বা সমাজকে ছোট করতে আমরা খুব পছন্দ করি!!

অন্য ব্রাহ্মণ মানুষের চেয়ে বরং দুই কদম এগিয়েই থাকতে বরাবর ভালোবাসি, আর সেজন্যই আজ আমাদের ভেতর কোলাহল (বিবাদ)অন্য সব সম্প্রদায় থেকে অনেক বেশি।

 আমাদের সমাজে কোন ব্যক্তি যদি তাঁর নিজস্ব মতামত দিতে নাই পারে তবে সেই ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের কি করে হিন্দুদের বর্ণশ্রেষ্ঠ মানুষ ভাবি???

নিজেদের মনের সংকীর্ণতা যদি দূর করে অন্যের মতামত এর প্রাধান্য নাই দিতে পারি তবে আমরা ঠিক কোন অর্থে শ্রেষ্ঠ মানুষ হই ????

একটা কথার প্রেক্ষিতে একশো কথা উঠবেই তবে সেটা অবশ্যই গঠনমূলক আলোচনা করে সমাধান করা উচিত।

শুধুমাত্র নিজের বাহবা বা পরিচিতি বাড়ানোর জন্য যেই জিনিস সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নেই তা নিয়ে অহেতুক তর্ক করি, আজকাল আমরা সেই ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি ধাবিত হই।কেউ কিছু বললে সেটা বিচার বিবেচনা করে বা এতটুকু পড়াশোনা করে তারপর সেই ব্যাপারে সমালোচনা করুন, কেউ তো নিষেধ করে নি কিন্তু তারমানে এই নয় যে কেউ কিছু বলতেই পারবে না।কারো মতামত আপনার সাথে মিলতে নাই পারে তাতে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে ????

আজকাল হ্যারিকেন দিয়ে খুঁজে সেই লোক পাওয়া যায় না, যে জানানোর জন্য আলোচনা করবে,যার থেকে আপনি কথা বলে বা আলোচনা করে কিছু শিখতে পারবেন।

বরং আপনি যদি কারো মতামত এর বিরুদ্ধে কথা বলেন,তবে আপনাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে দুই সেকেন্ড সময় নিবে না।আমাদের ব্রাহ্মণ সমাজের মধ্যে এই সমস্যাটা অনেক পুরানো আমরা কেউ কাওকে সহ্য করতে পারি না আর তাই শত্রুভাব কাজ করে বেশি যার কারনেই আজকে আমাদের সংখ্যাটা  নিম্নমুখী!!!


নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থাকা ভালো, তবে সেটা যেন মাত্রা অতিক্রম না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত সবাইকে।

তবেই আমরা আমাদেরকে একত্রিত করতে পারবো।

আজ আমাদের কাছে বিবিধ সমস্যা...

সেগুলি সমাধানের নিমিত্ত আমরা খুব কমসংখ্যক মানুষ সাধ্যমত প্রচেষ্টা করছি।। 

আপনারাও সুযোগ সুবিধা মতো আমাদের প্রচেষ্টা সফল করতে এগিয়ে আসুন, মনে রাখবেন একটা সামান্য বীজ থেকে প্রকান্ড বৃক্ষ জন্ম নেয় তাই আপনাদের একটা ক্ষুদ্রতম প্রচেষ্টাও নিজের সমাজের মানুষের কাছে বড় কিছু পুনরুদ্ধারে সফল হবেই।

কয়েকটি বর্তমান সময়ের ব্রাহ্মণ সমাজের কঠিন সমস্যা তুলে ধরতে চেস্টা করছি, যেগুলির হয়তো আমি আপনি সকলেই সম্মুখীন হয়েছি।।


১. ব্রাহ্মণদের প্রধান জীবিকা শাস্ত্রানুযায়ী যাজনিককর্ম, অধ্যাবসায় ইত্যাদি, কিন্তু বর্তমান দিনে আমাদের নিজের সংস্কৃতির কর্ম কয়জন সম্পাদিত করেন যারা করেন তারাও মুস্টিমেয় কিছু মানুষ, যদিও এমনিতেই আজ আমরা আমাদের অসংগঠিত মনোভাবের জন্য দেশের জনজাতির মধ্যে সম্ভবত ৪℅ বা লুপ্তপ্রায় সম্প্রদায়ের মধ্যে পড়ে গেছি, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। 


২.স্বাধীনতার পুর্ববর্তী সময়ে আমাদের বাংলায় বাঙালী ব্রাহ্মণরা সমাজে নানা কাজে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুসরন করে নানা সমাজ সংস্কারক মুলক কর্ম সম্পাদিত করে গেছেন, তাদের নাম বর্তমানে আমরা ভুলে গেছি,তারা কি আজকের এই ছিন্নমুল ব্রাহ্মণ সমাজের জন্য সংগ্রাম করে গিয়েছিলেন,তারা বাংলার ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন তাদের ধর্ম ও কর্মনিষ্ঠ জীবনের অবদানে।

আর আজ আমরা তাদের উত্তরসুরীরা কি করছি, সামান্য নিজের স্বার্থে নিজেদের সংস্কৃতি ও পিতৃপরিচয় হেয় করছি, আমরা ব্রাহ্মণরা সর্বদা নিজেদের সমালোচনায় জর্জরিত, কে কত বড় পন্ডিত, কে কত ধনী,কে কত মন্দ,কে কত লোভী,কে কত পাপী এই নিয়ে আমাদের সমাজ চলছে, এতে তো পতন অবশ্যম্ভাবী।

৩. আমাদের সমাজে যে সকল ব্রাহ্মণ গন নিজ দক্ষতার ওপর সমাজে নানা কর্মে প্রতিষ্ঠিত, তারাও কেউ কোনদিন নিজ বর্নের অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর মানুষদের কর্মে প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসে না, বাস্তবতা এটাই, যার জন্য ব্রাহ্মণ কুলে জন্মে যদি  নিজের সমাজের মানুষের জন্য সঙ্গতি থাকা স্বত্বেও সহায়তা করতে চেষ্টা করেন না, কেউ কেউ বলেন যে নিজের বর্ণের উপকার করার চাইতে একটা বিধর্মী বা সারমেয় প্রানীর উপকার করা ভালো কারন নিজের ঘরে সর্বদা বিভীষণ জন্মে 😢


৪.বিগত ও বর্তমান দিনে অনেক ব্রাহ্মণ গন দেশ পরিচালনার নানা কাজে নিযুক্ত রয়েছেন, তারাও কেউ কোনোদিন নিজ বর্নের মানুষের জন্য কোন বিশেষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিয়ে কোন প্রকার প্রচেষ্টা করেন নি, এগুলো কেউ অস্বীকার করতে পারেন না যার ফলশ্রুতিতে জেনেটিক ভাবেও ব্রাহ্মণ জাতি নিজের অস্তিত্বের চরম সংকটের মুহূর্তে।।। 


 

Friday, December 4, 2020

শূদ্রের অশৌচ বিধি নিয়ে কুমিল্লা মেঘনায় আলোচনার পর সিদ্ধান্ত,

  গীতার বক্তা সঞ্জয়,বিদুর প্রভৃতি অনেকেই শূদ্রবর্ণের শ্রদ্ধেও ব্যক্তিত্ব।আমরা তাদের শুদ্ধ সাত্ত্বিক সনাতন আদর্শের ধারক বাহক।জন্মগতভাবে যারা শূদ্র বর্ণ রয়েছেন তাদের মৃৃৃৃতাশৌচ কিংবা জননাশৌচে ত্রিশদিন অন্তে শুদ্ধ হতাম।এ ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের বংশ পরম্পরায় কখন কোন সন্দেহ বা দ্বিধা দেখা দেয়নি।আমরা সবাই মিলে মিশে তা পালন করতাম।সম্প্রতি আমাদের সমাজে অশৌচ নিয়ে নতুন মত প্রবেশ করে।নিজেদের মধ্যে কলহ দেখা দেয়।পাড়া পড়শিরা এ নিয়ে বিবাদে জড়ায়।এতে জনজীবনে অস্বস্তি নেমে আসে।নব্যপন্থীরা জবরদস্তি করে সর্ববর্ণের দশ দিন অশৌচ পালনে সবাইকে প্রলুব্ধ করতে থাকে।এই সংকট নিরসনে শ্রদ্ধেও চেয়ারম্যান সাহেবের আয়োজনে বিশাল সনাতন ধর্ম সভা অনুষ্ঠিত হয়।সেই অনুষ্ঠানে সর্ববর্ণের দশ দিন অশৌচের পক্ষে বাংলাদেশ হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির শ্রদ্ধেয় বক্তাদের মধ্যে শ্রীমৎ বিমল চন্দ্র চক্রবর্তীসহ বেশ কয়েক জন বক্তা তাদের মতের স্বপক্ষে আলোচনা করেন ।আর চির প্রাচীণ সনাতন আদর্শের পক্ষে আলোচনা করেন কুড়িগ্রাম থেকে আগত দু'জন বৈদিক শাস্ত্রবেত্তা পণ্ডিত একজন শ্রী পঙ্কজ ভাদোর অপরজন যুক্তিবাগীশ শ্রী রায়ন চক্রবর্তী শুভ মহাশয়।আলোচনায়  এই সিদ্ধান্ত সর্বজন মান্য হয় যে শূদ্র বর্ণের অশৌচ ৩০ দিন।আমরা নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে বিবাদ কলহ নিস্পত্তির জন্য আলোচনা করে পূর্বপুরুষের পালিত এই বিধিবিধানে সম্মত হই।এ নিয়ে আমাদের মধ্য একটা অঙ্গিকার নামা স্বাক্ষরিত হয় ।সনাতন জনসাধারণের হিতার্থে সেটি প্রকাশ করা হলো।


আশা করি আমাদের স্বজাতির সকলেই তাদের পূর্বপুরুষের নিয়ম অনুসারে চলবেন।



যোগীর হৃদয়ে তিনি বাস করেন না। এই কথার তাৎপর্য কি?

 অহং ব্রহ্মাস্মি

নাহং তিষ্ঠামি বৈকুন্ঠে 

যোগীনাং হৃদয়ে ন চ ;

মদ্ভক্তো যত্র গায়ন্তি 

তত্র তিষ্ঠামি নারদঃ।। [ ভাগবত ]

শ্লোক বিশ্লেষণঃ 

নাহং= ন( না) + অহং ( আমি)  

তিষ্ঠামি = বাস করি ;

বৈকুণ্ঠে --- বৈকুণ্ঠ ধামে 

#নাহং তিষ্ঠামি বৈকুন্ঠ -- আমি বৈকুণ্ঠে থাকি না। 

যোগীনাং হৃদয় ন চ = যোগীদের হৃদয়েও না অর্থাৎ যে সকল যোগী রিপুজয়ী হতে পারেন নি, আমি নারায়ণ তাদের হৃদয়েও থাকি না ; কিন্তু যোগসাধনা করে যে সকল যোগী রিপু জয়ী হতে পেরেছেন আমি তাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হই। 

যোগীদের হৃদয়ে যদি ভগবান আবির্ভূত না হতেন তবে তিনি গীতায় বলতেন না যে,  হে অর্জুন,  যোগী কর্মী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ; যোগী, জ্ঞানী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ; কাজেই হে অর্জুন,  তুমি হও। 

গীতায় যেহেতু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মাধ্যমে বিশ্ববাসিকে যোগী হতে উপদেশ করেছেন সেহেতু তি নি প্রকৃত যোগীর হৃদয়ে অবশ্যই বাস করেন কিন্তু যোগীর খাতায় নাম লেখালাম কিন্তু ঠিক ঠিক যোগসাধনা করে রিপুজয়ী হলাম না -- এরূপ যোগীর হৃদয়ে তিনি বাস করেন না। 

মদ্ভক্তো = আমার ভক্ত ; ভগবানের ভক্ত কারা?  যারা ভগবানের আদেশ নিষেধ মানেন তারাই ভগবানের ভক্ত। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে যোগী হতে উপদেশ করেছেন ; কাজেই ভগবানের কথা মেনে যারা যোগী হয়েছেন অর্থাৎ যোগদীক্ষা নিয়েছেন, তারাই ভগবানের ভক্ত। 

যত্র -- যেখানে 

গায়ন্তী -- গান করেন অর্থাৎ উপাসনা করেন ; 

তত্র তিষ্ঠামি -- সেখানে বাস করি 

নারদ -- হে নারদ 

#মদ্ভক্তো যত্র গায়ন্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদ--- হে নারদ, আমার ভক্তগন অর্থাৎ যোগসাধকগন যেখানে বসে যোগসাধনা করেন, আমি নারায়ণ সেখানেই বাস করি। 


অনুবাদঃ আমি বৈকুণ্ঠে থাকি না ; রিপু জয়ী হন নি এমন যোগীর হৃদয়েও আমি বাস করি না ; কিন্ত যারা রিপুজয়ী হওয়ার জন্য সদা চেষ্টাশীল সেই সকল যোগী যেখানে বসে যোগসাধনা করেন,  হে নারদ,  আমি সেখানেই বাস করি।

Monday, November 9, 2020

Dipanita kali puja, দীপান্বিতা কালীপূজা সময় নির্ধারণ

  <দীপান্বিতা কালীপূজা>


তত্র নিত্যত্বং নৈমিত্তিকত্বং কাম্যত্বঞ্চ জ্ঞেয়ম্।

"দীপান্বিতা পার্ব্বণায় স্মৃতা কাল্যর্চ্চনায় চ। মহানিশি দ্বিতীয়ং স্যাৎ পূর্ব্বেদ্যুর্ব্বাপ্ত্যনাপ্তয়োঃ।।"


"নিশার্দ্ধে না তিথির্নাস্তি উর্দ্ধঞ্চেদ্ভুত সংযুক্তা। তত্রাপি পূজয়েৎ কালীং ভুতযোগং ন লঙ্ঘয়েৎ।।"


যদা তুলার্কে মলমাসপাতঃ, তদা চেৎ পূর্ব্বামাস্যা তুলার্কগতা সতী মহানিশা ব্যাপিনী স্যাৎ, তদা তত্রৈব শ্যামাপূজা কার্য্যা, অন্যথা মহানিশাব্যাপিন্যাং মলান্তর্গতামাবাস্যায়ামপি, ন তু শুদ্ধমাসানুরোধেন বৃশ্চিকার্কে।  দীপান্বিতাশ্যামাপূজায়াস্তুলার্ক এব সর্ব্বতন্ত্রবিহিততৃত্বাৎ "তুলার্কং নৈব লঙ্ঘয়ে," দিতি তুলার্কলঙ্ঘননিষেধাৎ "নৈমিত্তিকানি কাম্যানি" ইত্যাদিদক্ষ বচনাচ্চ।


দীপান্বিতা কালীপূজার নিত্যত্ব, নৈমিত্তিকত্ব ও কাম্যত্ব তিনই আছে।

"দীপান্বিতা অমাবস্যা কালীপূজার জন্য প্রসিদ্ধ। তাহার মধ্যে কালীপূজা, অমাবস্যা দুই দিনে মহানিশা পাইলেও পূর্ব্বদিনে করিবে,না পাইলেও পূর্ব্ব দিনে করিবে।"

মহানিশা চলিয়া গেলে পর অমাবস্যা হইলে, সেই চতুর্দশীযুক্ত অমাবস্যাতে কালীপূজা করিবে, চতুর্দশীযুক্ত অমাবস্যা পরিত্যাগ করিবে না।" 

   যখন সৌর কার্ত্তিকমাস মলমাস পড়িবে, তখন পূর্ব্ব অমাবস্যা সৌর কার্ত্তিকে পড়িয়া মহানিশা পাইলে তাহাতে শ্যামাপূজা করিবে। মলমাসের অন্তর্গত অমাবস্যা মহানিশা পাইলে তাহাতেই শ্যামাপূজা করিবে। কিন্তু সৌর অগ্রহায়ণ মাসে করিবে না। কারণ দীপান্বিতা শ্যামাপূজা সকল তন্ত্রদ্বারাই সৌর কার্ত্তিকমাসে বিহিত হইয়াছে। "দীপান্বিতা শ্যামাপূজার সৌর কার্ত্তিকমাস" ত্যাগ করিবেনা অর্থাৎ সৌর কার্ত্তিকমাসেই দীপান্বিতা শ্যামাপূজা করিবে এইরূপ উক্ত আছে এবং "নৈমিত্তিক অথ চ কাম্য এইরূপ কর্ম্ম অশুদ্ধ কালেও করা যায়" এইরূপ দক্ষের বচন আছে।

Saturday, November 7, 2020

একাদশী লিষ্ট ২০২০/২০২১

 একাদশী কী?  একাদশীতে উপবাস করে বিষ্ণূপূজা করলে সর্বপাপ মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গতি হয় , একাদশীর প্রয়োজনীয়তা , সানাতন ধর্মে একাদশীর গুরুত্ব, একাদশীর মাহাত্ম্য আলোচন,   একাদশী মাহাত্ম্য: একাদশীর মাহাত্ম্য, একাদশী মাহাত্ম্য , একাদশী তালিকা 2020 ২০২১ , ২০২০ , ২০২২, ২০২৩ , 2021 2022, 2023 , একাদশী তালিকা ১৪২৭, পাপমোচনী একাদশী মাহাত্ম্য, নির্জলা একাদশী মাহাত্ম্য, Ekadashi Mahato , Ekadashi mahatmya pdf in bengali , ekadashi mahatmya in bengali pdf ekadasi mahatmya pdf ekadashi list 2020 ekadashi chart 2020


সনাতন ধর্মে জন্মান্তরবাদ, Transmigration in Hinduism

 সনাতন ধর্ম জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীঃ,Transmigration in Hinduism



সনাতন ধর্ম জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করে ।গীতায় বলা হয়েছে, " মানুষ জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে ।আত্মাও তেমনি জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে অন্য নতুন দেহ গ্রহণ করেন(২|২২)।"

আরো বলা হয়েছে, " তাঁরা সেই বিপুল স্বর্গলোক ভোগ করেন ।ভোগের পর পূণ্য ক্ষয় হলে আবার মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন ।এভাবে ত্রিবেদোক্ত ধর্মেরঅনুষ্ঠান করে ভোগকামী ব্যক্তিগণ সংসারে যাতায়াত করে( ৯|২১)।"

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে পূণ্য বা ভালো কাজের ফলে মানুষ স্বর্গে গমন করে ।যখন পূণ্য ক্ষয় হয়ে যায়, তখন পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহে জন্ম নিতে হয়।কর্মের ফল অনুসারে আবার পরবর্তী জন্ম নির্ধারিত হয়।এভাবে ভালো কাজের জন্য স্বর্গেএবং খারাপ কাজের জন্য নরকে গমন করতে হয়।ইহার নাম সংসারচক্র।

শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, "জীবের উপাধিরূপ লিঙ্গ শরীর তো তার মোক্ষলাভ পর্যন্ত তার সাথে থাকে এবং সূক্ষ্ম পঞ্চভভূত, দশ ইন্দ্রিয় ও মনের কার্যরূপ এই স্থূল  শরীর হলো তার ভোগাধিষ্টান ।এই দুটি পরস্পর মিলিত হয়ে কার্য না করার নামই' মৃত্যু ' এবং এই দুইয়ের পরস্পর মিলিত হয়ে একসাথে প্রকাশ হওয়াকেই 'জন্ম ' বলা হয়(৩|৩১|৪৪)।"

এই শ্লোকে মৃত্যুর সংজ্ঞা বর্ণনা করা হয়েছে ।আত্মা পূর্বের কর্মানুসারে নতুন দেহ প্রাপ্ত হয়।ইহার নাম আত্মার জন্ম এবং যখন বিশেষ কর্মের ফল শেষ হয় আত্মা উক্ত শরীর ত্যাগ করে ইহার নাম মৃত্যু ।প্রকৃত প্রস্তাবে আত্মার কোনো মৃত্যু নেই, শুধু দেহের পরিবর্তন হয় মাত্র ।এই আত্মা সম্পর্কে যার এই জ্ঞান আছে তিনি আত্মার পরিবর্তনের জন্য শোক করেন না।

পবিত্র গীতায় আরো বলা হয়েছে, "যদি রজোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু ঘটে ,তবে কর্মাসক্ত মনুষ্য- যোনিতে জন্ম হয়।আর যদি তমোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু ঘটে তবে পশ্বাদি মূঢ় যোনিতে জন্মে( ১৪|১৫)।" 

এই শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, রজগুণ সম্পন্ন মানুষ পরবর্তী জন্মে কর্মাসক্ত মানুষ হয় এবং তমগুণ সম্পন্ন মানুষ অর্থাৎ পশু স্বভাবের মানুষেরা মৃত্যুর পর পশু হয়।মানুষ জন্মের পরও কর্ম অনুসারে বিভিন্ন জন্ম হতে পারে ।শুধুমাত্র মানব জন্মের কর্মের বিচার হয়,অন্য কোনো জন্মের বিচার হয় না।যেমন কুকুরের কর্মের জন্য কোনো বিচার হবে না ।কুকুর জন্মটাই একটি শাস্তিস্বরূপ ।

শ্রীমদ্ভাগবতে আরো বলা হয়েছে, " সব নরক ভোগের পর এবং শূকর কুকুরাদি প্রজাপতিতে যত ক্লেশ আছে সেই সমস্ত ভোগ করে শুদ্ধ হবার পর সে আবার মনুষ্য প্রজাতিতে জন্মলাভ করে( ৩|৩০|৩৪)।" 

সুতরাং দেখা যায় যে, সনাতন ধর্মে জন্মান্তরবাদের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ।তবে যারা  জন্মান্তরবাদ বিশ্বাস করেন না বা করতে চান না তাদেরকে  বুঝানোর জন্য পরবর্তী পোস্টে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো । উল্লেখ্য, আমার বিগত পোস্টে পুত্রহীনদের স্বর্গ ও গতি না থাকার বিষয়ে গরুড় পুরাণ  থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম এবং এই বিষয়ে জানার অভিপ্রায় নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম ।কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাইনি ।তবে আমার আজকের পোস্ট পুত্রহীন এবং সন্তানহীনদের মনের কষ্ট দূরীভূত হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ।ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী গীতার আলোকে সুস্পষ্ট যে, মানুষের কর্ম অনুযায়ী ফললাভ  হয়।কোনো পুত্র সন্তান মা বাবার প্রার্থিত ফলদান করতে পারে না।তবে ভগবানের কাছে আবেদন করতে হবে ।আবেদন মঞ্জুর করা না করা ভগবানের ইচ্ছা ।আর শাস্ত্র  নির্দেশিত সকল সদাচার পালন করা কর্তব্য ।নমস্তে কর্মভ্য নমঃ ।ফলদাতা হলেন ভগবান স্বয়ং যার যার কর্মের উপর ভিত্তি করে।আমার লিখা ভালোভাবে পাঠ করে ভদ্রোচিত ভাষায় মন্তব্য ও গঠনমূলক সমালোচনা কাম্য ।আপনাদের মন্তব্য আমার লিখার উৎসাহ বাড়ায়।জানি," গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।" তবুও আমার ব্লগ বন্ধুদের আন্তরিকতাও একাগ্রতা সহকারে আমার লিখা পাঠ করে  মূল্যায়ন কাম্য

Wednesday, October 28, 2020

ত্রিপুষ্কর যোগ কী, কেনই বা হয় ত্রিপুষ্কর যোগ হয়

 আজকে আমরা জানবো ত্রিপুষ্কর যোগ কী, কেনই বা হয় ত্রিপুষ্কর যোগ. উক্ত যোগে কোনো ব্যাক্তির মৃত্যু হলে 1ম পাদ. 2য় পাদ. ও 3য় পাদে শান্তির বিধান কী? ব্যাখ্যা: কোনো ব্যাক্তির মৃত্যু যদি শনিবার, বা মঙ্গলবারে,  দ্বিতীয়া, সপ্তমী তিথি, দ্বাদশী তিথি,এবং কীর্তিকা পুনর্বসু, উত্তর ফাল্গুনী, বিশাখা উত্তরাষাঢ়া ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্র যুক্ত হইলে ত্রিপুষ্কর যোগ হয়.  "1"-বার ও তিথিতে এক+এক পাদ করিয়া দুইপাদ,এবং নক্ষত্রের দুইপাদ ধরাহয়,  এই চারিপাদ যোগে চতুষ্পাদ পুষ্কর হয়!আবার ইহাদের মধ্যে ""2."""বারের এক পাদ+নক্ষত্রের দুই পাদ ইহার সম্মিলিত যোগে= ত্রিপাদ পুষ্কর হয়, বা 3."" তিথীর একপাদ+নক্ষত্রের দুই পাদ= ত্রিপাদ পুষ্কর হয়. 4.এছাড়াও বার ও তিথীর এক পাদ+এক পাদ=দুই পাদ+নক্ষত্রের দুই পাদ=চার পাদ পুষ্কর হয়!5.আবার শুধু বার দোষ লাগলে বা  নক্ষত্র দোষের যেকোনো একটি লাগলে=এক পাদ দোষহয়, 6.আবার বার ও তিথীর যে কোনো দুইটি যোগের সম্মিলিত দোষ লাগলে তাহাকে দ্বিপাদ দোষ বলা হয়. 7.আবার শুধু যদি নক্ষত্রের দোষ লাগলে দ্বিপাদ দোষ বলা হয়.এমতাবস্থায় বরাহ সংহিতোক্ত পুষ্করশান্তি প্রয়োগ অনুযায়ী গ্রহশান্তি ওপুষ্করশান্তি অবশ্যই কর্তব্য. ইহা পূর্ণচন্দ্র পঞ্জিকায় লিখিত বিধি গ্রহণ যোগ্য হইতে পারে.একপাদ দোষে ও দ্বিপাদ দোষে. ও ত্রিপাদ দোষে বা চতুষ্পাদ দোষে. সর্ব্বাগ্রে পুস্করাধিপতি দেবতাগণের যথা-- 1.যম.2ধর্ম্ম.3চিত্রগুপ্ত 4.পুষ্কর পুরুষের পূজা. এবং নবগ্রহ মন্ডল প্রস্তুতপূর্ব্বক তাহার উপর গ্রহরূপী জনার্দ্দন অর্থাৎ বিষ্ণুকে স্থাপন পূর্বক শোড়শ উপচারে পূজা অবশ্যই করা উচিত. এছাড়াও তদঙ্গিভুত. """"1""""একপাদ দোষের বিধান"""অষ্টোত্তর শতসংখক সচন্দন তুলসীপত্রদান. ও শ্রীবিষ্ণুর পূজা. 108 দুর্গানাম জপ. ও 108 মধুসূদননাম জপ. একটি মৃত্তিকা নির্মিত পার্থিবশিব পূজা. একবৃত্তি শ্রীবিষ্ণুর সহস্রনাম পাঠ. চন্ডীরপূজা ও একবৃত্তি দেবীমাহাত্ত্ব পাঠ.  গ্রহপূজা, স্তব, স্তোত্র, পাঠান্তে স্ব স্ব সমিধ দ্বারা প্রত্যেকের  হোম করণীয়.*এবার দ্বিপাদ দোষের শান্তির বিধি."""""""উপরিউক্ত দেবতাদের পূজার সহিত. অষ্টোত্তর  শতসংখক সচন্দন তুলসীপত্রদ্বারা শ্রীবিষ্ণুরপূজা, 1000 দূর্গানাম জপ ও 1000 মধুসূদন নামজপ, চারমূর্তি মৃত্তিকানির্ম্মিত পার্থিব শিবেরপূজা,চন্ডীর পূজা ও একরূপ দেবীমাহাত্ব পাঠ, যথাশক্তি কাঞ্চন দান, নবগ্রহের পূজা. ও স্তব স্তোত্র পাঠান্তে স্ব স্ব সমিধ দ্বারা মন্ত্রে হোমকরনীয়.*এবার ত্রিপাদ ও চতুষ্পাদ দোষের শান্তির বিধান বলি তেছি *উপরি উক্ত


 পুস্করাধিপতিদের পূজার সহিত, অষ্টোত্তর সহস্র সংখক সচন্দন তুলসীপত্র দ্বারা শ্রীবিষ্ণুর পূজা ও বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ, 10হাজার সংখক দূর্গানাম জপ ও 10 হাজার সংখক মধুসূদন নামজপ,দ্বাদশটি মৃত্তিকা নির্ম্মিত শিবলিঙ্গেরপূজা, চন্ডীরপূজার সহিত তিনরূপ দেবীমাহাত্ত্বপাঠ, চার আনা ওজনে কাঞ্চনদান,শ্রীবিষ্ণুর সহস্রনাম পাঠ, নবগ্রহপূজা, স্তব ও স্তোত্র পাঠ, শ্রী বিষ্ণুর 108 উড়ম্বর সমিধ দ্বারা বিশেষ হোম, ও শোড়শপচারে শ্রীবিষ্ণুর পূজা. ও প্রত্যেকের স্ব স্ব মন্ত্রের সহিত সমিধ দ্বারা হোম. বলিদান. রক্ষাকরণ. ইত্যাদি.***

Monday, October 19, 2020

উপনয়নের অধিকার অনধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা

 


উপনয়ন ছাড়া শ্রৌত ও স্মার্ত কাজে অধিকার হয় নাঃউপনয়ন ছাড়া শ্রৌত ও স্মার্ত কোনো কাজে অধিকার হয় না।মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, " বেদপ্রদানাদাচার্যং পিতরং পরিচক্ষতে ।ন  হ্যস্মিন্ যুজ্যতে কর্ম কিঞ্চিদামৌঞ্জিবন্ধনাৎ( ২|১৭১)।" সরলার্থ হলো, "উপনয়নের আগে শ্রৌত ও স্মার্ত কোনো কাজে অধিকার হয় না।আচার্য উপনয়ন দিয়ে এবং বেদ অধ্যয়ন করিয়ে উক্ত কাজে অধিকার করিয়ে দেন,তাই আচার্য মহান উপকারক বলে মনু প্রভৃতি এঁকে পিতা বলেছেন ।"নারীদের উপনয়ন সংস্কার না থাকায় শ্রৌত ও স্মার্ত কর্ম হতে বঞ্চিত করা হয়েছে ।এমনকি ব্রাহ্মণ সন্তানদের উপনয়ন না হওয়া পর্যন্ত শ্রৌত ও স্মার্ত কর্ম করার নিষেধ দেয়া হয়েছে ।কাজেই, যারা উপনয়ন সংস্কার ছাড়া শ্রৌত ও স্মার্ত কর্ম করছেন তারা শাস্ত্রীয় বিধানমতে করছেন না।হয়তো কেউ কেউ বলবেন, মনুস্মৃতি সত্য যুগের জন্য প্রযোজ্য ।আমি বলি, মনু হলেন মানব জাতির আদি পিতা ।তাই পিতার কথা আমাদের অবশ্যই মেনে চলা উচিত ।কারণ পিতার কথা কখনো বাসী হয় না।তাছাড়া শ্রুতির সাথে বিরোধ হলে স্মৃতি অবশ্যই অগ্রাহ্য ।আমার ব্যাখ্যা ধর্মশাস্ত্র তথা স্মৃতি শাস্ত্রের আলোকে, আমার কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়।তবে কেউ শাস্ত্র না মেনে শ্রুতি ও  স্মৃতি অধ্যয়ন করলে  সেটা তাদের নিজস্ব দায়িত্ব ।

#অশৌচাবস্থায় নিত্য, কাম্য বা দান হোমাদি,পূজা করা শাস্ত্রে নিষেদ করা হয়েছে কি না আসুন দেখে নিই।

 অশৌচাবস্থায় নিত্য,  কাম্য বা দান হোমাদি,পূজা করা শাস্ত্রে নিষেদ করা হয়েছে।।


বর্তমানে বৈষ্ণব নাম দ্বারি নব্য কৃষ্ণ ভক্তগন গীতা ভাগবত পাঠে আলোচনার নামে ধর্মীয় আলোচনা করতে গিয়ে অশাস্ত্রীয় বিধি দিয়ে থাকেন, উনাদের বক্তব্য হলো :অশৌচ অবস্তায় নিত্যকর্ম্ম অনুসারে নিজ দেব গৃহে পূজা করা যাবে,কারন দেবতা কে অভূক্ত রাখা যাবে না।পুরোহিত গন যে ব্যাবস্থা দিয়ে থাকেন তা সম্পোন্য ভূল,তাই অশৌচ অবস্থায় ও দেবতার পূজা করে জাবে, নিজ ইষ্টদেবতা কে অভূক্ত রাখতে নাই,(এরখম কুযুক্তিদ্বারা শাস্ত্রনিষিদ্ধ কর্ম করাতে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে নব্য কৃষ্ণভক্ত পাষণ্ডগন।)

আসুন দেখি শাস্ত্রে কি বলা আছে --

(১)প্রথম প্রমাণ-ভগবান বেদব্যাস বলিলেন-

দশাহং প্রাহুরাশৌচং সপিণ্ডেষু বিপশ্চিতঃ।

মৃতেষু বাপি জাতেষু ব্রাহ্মণানাং দ্বিজোত্তমাঃ।।

নিত্যানি চৈব কর্ম্মাণি কাম্যানি চ বিশেষতঃ।

ন কুর্য্যাদ্বিহিতং কিঞ্চিৎ স্বাধ্যায়ং মনসাপি চ।।


অনুবাদঃ ব্যাস বলিলেন-সপিণ্ড জননে বা সপিণ্ড-মরণে ব্রাহ্মণের দশাহাশৌচ মুনিগণ বলিয়াছেন।এই অশৌচ অবস্থায় নিত্য,কাম্য বা অন্য বিহিত কর্ম্ম কিছুই করিবে না এবং মনে ও বেদের আলোচনা করিবে না।

কূর্ম্ম-পুরাণ, উপরিভাগ২৩তম অধ্যায়১-২নং শ্লোক।


 (২)এই নিয়ম শুধু ব্রাহ্মণের জন্য নয়,চার বর্ণের পৃথক পৃথক অশৌচ অবস্থায় যজ্ঞ পুজা দেবগৃহ প্রবেশকরে নিত্য পুজা ও ভূগ নৈবদ্য প্রদান করা নিষেদ,

বেদব্যাস বলিলেন-

দশাহং ব্রাহ্মণস্তিষ্ঠেদ্দানহোমবিবর্জ্জিতঃ।

ক্ষত্রিয়ো দ্বাদশাহঞ্চ বৈশ্যো মাসার্দ্ধমেব চ।।

শূদ্রশ্চ মাসামাসীত নিজকর্ম্মবিবর্জ্জিতঃ।


অনুবাদঃ ভগবান ব্যাস বলিলেন-জন্ম ও মরণ উপলক্ষে ব্রাহ্মণ দশাহ,ক্ষত্রিয় দ্বাদশাহ,বৈশ্য মাসার্দ্ধ যাবৎ দান হোম বর্জ্জন পূর্ব্বক থাকিবে।শুদ্র এক মাস নিজ কর্তব্য বর্জ্জন করিবে।অর্থাৎ নিত্য নৈমিত্তিক কাম্য কর্ম্ম কর্ম্মাদি অনুষ্টান করিবে না।

ব্রহ্মপুরাণ২২১/১৪৭-১৪৮।।


(৩)ঐ একই কথা বলা হয়েছে মার্কেণ্ডপুরাণে

জননাশৌচেও মরণাশৌচে বিপ্রগণ দশদিন যাবৎ দান  হোমাদি  নিত্যকর্ম্ম -বর্জ্জিত হইয়া অবস্থিতি করিবেন এবং ক্ষত্রিয়গণ দ্বাদশদিন,বৈশ্যরা পঞ্চদশ দিন ও শুদ্রগণ একমাস যাবৎ দান ঐরূপ আচরণে থাকিবে।


ততঃ পরং নিজং কর্ম্ম কুর্য্যঃ সর্ব্বে যথেপ্সিতম।


তৎপরে সকলেই শাস্ত্রোক্ত বিধানে স্ব স্ব কর্ম্মের অনুষ্টান করিবে।

মার্কেণ্ডপুরাণ ৩৫/৪০-৪১

অশৌচ অন্তহলে তৎপরে স্ব স্ব কর্ম্মের অনুষ্টন  শাস্ত্রউক্ত ভাবে  সম্পোন্য করিবে।

শাস্ত্র বিধি মান্য করেই আমাদের কে চলতে হবে, কি কর্ম্ম কি অকর্ম্ম তা শাস্ত্র হতেই নির্নয় করতে হবে ইহা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আদেশ।

আর এই আদেশ কে মান্য করা আমাদের সকলের ই কর্তব্য।।

                          জয় শ্রীকৃষ্ণ।।

                   ((শ্রী সমীরণ ভট্টাচর্য্য))

Friday, May 17, 2019

প্রকৃত বৈষ্ণব কে? প্রকৃত বৈষ্ণের সংজ্ঞা কি?

প্রকৃত বৈষ্ণব কে?
বেদবিদ্যানুরক্তা যে বিপ্রভক্তিরতাঃ সদা।
    নপুংসকা পরস্ত্রীষু জ্ঞেয়াস্তে বৈষ্ণবা জনাঃ।।
অনুবাদ-যাহারা বেদবিদ্যানুরক্ত,সর্ব্ব বিপ্রভক্ত ও পরদারবিমুখ
তাহারাই বৈষ্ণবজন।।
                (পদ্মপুরান,ক্রিয়াযোগসারঃ২/৯০)
নব্য বৈষ্ণব --এনারা'বিপ্রভক্তিরতা'তো দূরের কথা ব্রাহ্মণদের অপদস্হ করতে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকেন এবং বর্ণাশ্রম  মানেন না
তাছারা কলির ব্রাহ্মণদের 'রাক্ষস' বানানোর জন্য ভুয়া শ্লোখ তৈরী করতেও এনারা ওস্তাদ।এনাদের লিখিত পুস্তকে পাওয়া যায়।
কলিযুগে রাক্ষস -সকল-বিপ্রের ঘরে।
    জন্মিবেক সুজনেরে হিংসা করিবারে।
ইত্যাদি বলে বরাহ পুরানের একটি খন্ডিতাংশ প্রয়োগ করে।
সমাধান-অনুসন্ধানপূর্বক দেখা গিয়াছে রবাহ পুরানে ঐরকম কোন শ্লোখ অস্তিত নেই।যদি কলির ব্রাহ্মণ রাক্ষস হয়,তবে শ্রীচৈতন্য  মহাপ্রভু, শ্রীমন্নিত্যানন্দ মহাপ্রভু, শ্রীঅদ্বৈত মহাপ্রভু, গদাধর,শ্রীবাস,শ্রীরুপ গোস্বামী, শ্রীসনাতন গোস্বামী, শ্রীজীব গোস্বামী প্রভৃতি প্রধান প্রধান বৈষ্ণবচার্য্যগণের পরিচয় কি?কারণ'তাঁরা প্রত্যেকেই তো ব্রাহ্মণ সন্তান! সেজন্য প্রকৃত বৈষ্ণব সর্বদা বর্ণধর্মের পালন করবে এবং ব্রাহ্মণগণের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে চলবে।ব্যাসদেব বলেছেন'
        পাষণ্ডসঙ্গরহিতা বিপ্রদ্বেষবিবর্জ্জিতাঃ।
        সিঞ্চেয়ুস্তুলসীং যে চ জ্ঞাতব্যা বৈষ্ণবা নরাঃ।।
অনুবাদ-যাঁহারা পাষণ্ডসঙ্গ করেন না।ব্রাহ্মণে যাহাদের দ্বেষ নাই,এবং যাঁহারা তুলসী তরু সেক করেন,সেই নরগণকেই বৈষ্ণব বলিয়া জানিবে, 
এবিষয়ে এই ভিডিও আলোচনাটি দেখলে আরো  কিছুটা সহজে বুঝতে পারবেন। 

  
                      (পদ্মপুরান, ব্রহ্মখণ্ড ১/২৬)
অথ চ যস্ত্বিহ বা আত্নসম্ভাবনেন স্বয়মধমো
    জন্মতপোবিদ্যাচারবর্ণাশ্রমবতো বরীযকো ন বহু মন্যেত স 
    মৃতক এব মৃত্বা ক্ষারকর্দমে নিরয়েহবাক্ শিরা নিপাতিতো
    দুরন্তা যাতনা হ্যশ্নুতে।।
অনুবাদ- যে ব্যক্তি নিম্ন শ্রেনীতে জন্মগ্রহন করেও মিথ্যা অহংকারে জন্ম,তপস্যা,বিদ্যা,আচার,বর্ণ ও আশ্রম উৎকৃষ্ট পূজনীয় ব্যক্তির সম্মান না করে,সেই ব্যক্তি জিবন্নৃত।দেহান্তে তাহাকে ক্ষারকর্দম নামক নরকে অধোমুখ করিয়া নিক্ষেপ করা হয় এবং সেখানে তাকে দুরন্ত যাতনা ভোগ করিতে হয়।
ব্রাহ্মণের দ্বেষকারী ব্যক্তির ভগবানের আরাধনার কোন ফলই
   হয় না।দেখুন"
   যো বা কো বাপি বিপ্রেন্দ্র বিপ্রদ্বেষপরায়ণঃ।
   যদ্যর্চ্চয়তি গোবিন্দং সা পূজা বিফলা ভবেৎ।।
অনুবাদ- ব্রাহ্মণ প্রতি দ্বেষ-পরায়ণ যে কোন ব্যক্তি,যদি ভগবান্ গোবিন্দ্রের পুজা করে,তাহা হইলে তৎকৃত সেই পুজা বিফল হইবে।
                  (বৃহন্নারদীয়া পুরান'৩৫/৬)
 একদিকে মর্কট বাবাজীগণ বলেছেন,কলির ব্রাহ্মণ রাক্ষস, আরেকদিকে শাস্ত্রে কি বলা আছে দেখুন।
জৈমিনি ঋৃষি বলেছেন,
     তস্মৎ কলিযুগে তস্মিন ব্রাহ্মণো বিষ্ণুরেব চ।
     উভৌ গতিশ্চ সর্ব্বেষাং---!!
অনুবাদ- এই জন্য সেই বিষম কলিযুগে ব্রাহ্মণ ও বিষ্ণু এই উভয়ই
সকলের গতি।
       (স্কন্দপুরান,বিষ্ণুখন্ডে,পুরুষোত্তমহক্ষেত্রমাহাত্ন ৩৮/৪৪)
                      ''  তাই সাধু সাবধান,,
     
যারা পিতামাতা কে বরণপোষণ না করে ছুরে ফেলে,বৈষ্ণব  হওয়া জন্য পাগল"তাদের জন্য শাস্ত্রীয় কিছু রেফারেন্স  "দেখুন।
বৃহদ্ধর্ম পুরানে ব্যাসদেব বলেছেন"
  ♣পিতা যস্য ক্কচিদ্রুষ্টো ন তস্য কস্যচিদগতিঃ।
      জপো দানং তপো হোমম স্নানং তীর্থক্রিয়াবিধিঃ।
      বৃথৈব তস্য সর্ব্বাণি কর্ম্মাণ্যন্যানি কানিচিৎ।।
      করোতি সর্ব্বদেবেশং পিতরজ্ঞনুতপ্য যঃ।
       জপানি বিফলং তত্র দুগ্ধকক্ষিত্যুপ্তবীজবৎ।।
অনুবাদ- পিতা যাহার কখনও রুষ্ট হন,তাহার গতি কোথাও নাই,জপ,দান,তপস্যা,হোম,স্নান,তীর্থসেবা,বা অনন্য সমস্ত কর্ম্মই তাহার বিফল।সর্ব্বদেবতাশ্রেষ্ট পিতার উপাসনা না করিয়া যে,কোন ধর্ম্মকার্য্য করে,পিতার অনুতাপরুপ তীব্রবিষ যে পুত্রকে দুগ্ধ করে,প্রজ্বলিত ক্ষেত্রে রোপিত বীজের ন্যায় তাহার জপাদি ধর্ম্মকার্য্য বিফল হইয়া তাকে।
                (বৃহদ্ধর্ম পুরান,পূর্বাবখন্ড ১/১৮,১৯)

♣পিতৃভক্তা মাতৃভক্তা জ্ঞাতিপোষণতৎপরাঃ।
    ধর্ম্মেপদোশিন যে চ জ্ঞেয়াস্তে বৈষ্ণবা জনাঃ।।
অনুবাদ- যাহারা পিতৃমাতৃভক্ত, জ্ঞাতিপোষণরত, ও ধর্ম্মেপদোশক, তাহারাই বৈষ্ণব জন।
                 (পদ্মপুরান, ক্রিয়াযোগসারঃ২ /৮৮)

ভগবান ব্যাস বহুপূর্বেই বলেছিলেন"
♣মধুদর্শিতামার্গেন পাপিষ্ঠা বৈষ্ণবাঃ কলৌ।
    ভবিষ্যন্তি ততো ম্লেচ্ছাঃ শুদ্র যূথবহিস্কৃতাঃ।।
অনুবাদ--কলিকালে মধু-দর্শিতা-পথানুসারী পাপিষ্ঠ বৈষ্ণব অনেক হইবে,অনন্তর জাতিব্ষ্ট শূদ্র এবং ম্লেচ্ছাগণ-এই বৈষ্ণব পথাবলম্বী হইবে।
                     (সৌরপুরান-৩৯/৭৯)
শ্রীভগবান বলেছেন
 ♣মন্যুর্নিপততে যস্মিন পুত্রে পিত্রোশ্চ নিত্যশঃ
     তন্নিরয়ং নাবাধেহহংন ধাতা ন চ শঙ্করঃ।।
অনুবাদ-যে পুত্রের প্রতি পিতা বা মাতার কোপ নিপতিত হয়,আমি বিধাতা বা শঙ্কর আমরা কেহই তাহার নরক লাভের অন্তরায় হইতে পারি না।।
                    (পদ্মপুরান, সৃষ্টিখন্ড,৫০/১৭১)
দেবতা পূজা, মা বাবা ও অতিথি সেবা এবং আচার্যপথ অনুসরণ প্রসঙ্গেঃ                                                 ইসকন পন্থী বৈষ্ণব ও অন্যান্য বৈষ্ণবদের কেউ কেউ বলে থাকেন ,কৃষ্ণ উপাসনা করলে দেবতার পূজা এবং মা বাবার সেবা করার কোন প্রয়োজন নেই ।আমি মনে করি পরমেশ্বরের উপাসনার পাশাপাশি দেবতার পূজা ও মা বাবার সেবা করা অবশ্য কর্তব্য যা শাস্ত্রাজ্ঞা ।দেবতা সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের এক একটি শক্তি।দেবতা সাক্ষাত ঈশ্বর এবং মা বাবা সাক্ষাত দেবতা ।দেবতা ও মা বাবার সেবা ব্যতিরেকে সকল উপাসনা নিষ্ফল ।মা বাবাকে আঘাত দিয়ে ব্রহ্মচারী হওয়াও সঠিক নয়।কেবল মা বাবার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে বাবা মার অনুমতি সাপেক্ষে আখড়ায় অবস্থান করা ও ব্রহ্মচারী হওয়া বাঞ্ছনীয় ।আমার মতে যারা জন্মদাতা বাবা এবং গর্ভধারিণী মায়ের সাথে বিট্রে করে ,তারা  ঈশ্বরের সাথে ও বিট্রে করতে পারে ।পবিত্র কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের অংশ তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে, দেবপিতৃকার্যাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম ।মাতৃদেবো ভব।পিতৃ দেবো ভব।আচার্যদেবো ভব ।অতিথি দেব ভব।যান্যনবদ্যানি কর্মাণি ।তানি সেবিতব্যানি ।নো ইতরাণি।যান্যস্মাকং সুচরিতানি।তানি ত্বয়োপাস্যানি।নো ইতরাণি ।অর্থাৎ দেবকার্যে ও পিতৃকার্যে অমনোযোগী হবে না; মাতা,পিতা,অতিথি এবং আচার্য যেন তোমার দেবতা হন অর্থাৎ দেবতাজ্ঞানে তাঁদের পূজা করবে ।যে সকল অনুষ্ঠান অনিন্দিত তাদের অনুষ্ঠানই তোমার কর্তব্য, নিন্দিত কর্মের অনুষ্ঠান করবে না ।আমাদের সদাচারসমূহের অনুষ্ঠানই তোমার কর্তব্য, যা অসৎকর্ম তথা সদাচার নহে তার অনুষ্ঠান করবে না ।( প্রথম অধ্যায়, একাদশ অনুবাক, দুই নং মন্ত্র) এখানে দেবতার কার্য ( যজ্ঞাদি)এবং পিতৃকার্য( তর্পণাদি কর্ম) অবহিত হয়ে নিয়মমতো সম্পাদন করার কথা ও,মাতা, পিতা,আচার্য এবং অতিথিকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করার কথা বলা হয়েছে ।লোকসমাজে যে সকল কর্ম নিন্দনীয় বলে বিবেচিত হয়,সেগুলো না করার কথা এবং আচার্যগণের শোভন আচরণ অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে ।


তাহলে পবিত্র বেদের আলোকে দেবতার পূজা এবং মা বাবা,অতিথি সেবার কথা এবং আচার্যগণকে অনুসরণ করার কথা বলা থাকলেও কোন শাস্ত্রের আলোকে কেউ কেউ স্ববিরোধী কথা বলে থাকেন তা আজকের জিজ্ঞাস্য ।আর সরলমনা পাঠকরা জেনে শুনে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস রহিল । তবে যারা দেবতা পূজা এবং মা বাবার সেবা ও অতিথি সেবা শাস্ত্র বহির্ভূত মনে করেন এবং মহাজনদের পথ অনুসরণ করতে বাধা দেন তাদের ফাঁদে না পড়ার জন্য নিজে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করুন এবং সঠিক পথ খুঁজে বের করুন ।যাহোক, প্রত্যেক মত ও পথে সত্যনিষ্ঠ,আদর্শবাদী লোক আছেন যারা প্রশংসার যোগ্য ।যারা জেনে শুনে অথবা অজ্ঞতাবশতঃ মানুষকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করার করার চেষ্টা করে কেবল নিজেদের দল ভারী করতে চান তাদের থেকে সতর্ক হওয়ার জন্যই আমার লেখনী ধারণ ।মনের অজান্তে ভাষাগত দৈন্যতা ও শব্দ চয়নগত ত্রুটি বিচ্যুতিজনিত কারণে কারো মনে আঘাত দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থী ।
আধুনিক_যুগে সনাতন_জাতির_প্রথম_সংগঠক
বিভিন্ন মত এবং পথে শতধা বিভক্ত সনাতন হিন্দু ধর্মকে রক্ষার জন্য
যুগে যুগে বিভিন্ন মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে। সনাতন ধর্ম শাশ্বত এবং
ঈশ্বর প্রবর্তিত পরমমুক্তির পথ। চিরকালই এ ধর্ম ছিল, আছে এবং
থাকবে; এর কোন বিনাশ নেই কারণ ঈশ্বর স্বয়ং এ ধর্মের প্রবর্তক এবং
রক্ষাকর্তা। তাইতো যুগে যুগে এ ধর্ম কখনো সঙ্কুচিত অথবা কখনো
প্রসারিত অবস্থায় থাকে। এমনি এক সঙ্কুচিত ঘোর দুর্দিনে ভগবানের
দিব্য ঐশ্বর্যের কিঞ্চিৎ কণা নিয়ে আমাদের মাঝে আসেন এবং
আলোর পথ দেখান শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য। তাঁর জন্ম ৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দের
(মতান্তরে ৭৮৮ খ্রি.) ১২ বৈশাখ শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে কেরালা
প্রদেশের ‘কালাডি’ নামক একটি ছোট্ট গ্রামে। পিতা শিবগুরু এবং
মাতা বিশিষ্টা দেবী।
জন্ম থেকেই অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা এবং ধীশক্তির অধিকারী
ছিলেন আচার্য শঙ্কর। মাত্র তিন বছর বয়সেই তিনি তাঁর মাতৃভাষা
মালয়ালাম পড়া-লেখার দক্ষতা অর্জন করেন। এর ধারাবাহিকতায়
তাঁর বয়স যখন সাত বছর তখন তিনি বেদবেদান্তসহ বিভিন্ন
ধর্মশাস্ত্রে এবং ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি
ছিল অসাধারণ। একবার যা শুনতেন পরক্ষণেই তার অবিকল বলে দিতে
পারতেন।
সনাতন সত্য ধর্মের বিজয় পতাকা দিকে দিকে উড্ডীন করার জন্যে
আচার্য শ্রীশঙ্কর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে
বেড়িয়েছেন। পূর্বে কামরূপ (আসাম), ঢবাক (ঢাকা) থেকে পশ্চিমে
গান্ধার (আফগানিস্তান) এবং দক্ষিণে তামিলনাডু থেকে উত্তরে
তিব্বত সর্বত্র তিনি প্রচার করে বেড়িয়েছেন বৈদিক ধর্মদর্শন।
বৈদিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত এবং
ঈশ্বরই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা।
সম্রাট অশোক মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজকোষ শূন্য করে দিয়ে বৌদ্ধমত
প্রচারের নেশায় পাগলপ্রায় হয়ে যান। তিনি যুবসমাজকে কর্মবিমুখ
সন্ন্যাসের পথে প্রোৎসাহিত করেন। তিনি সৈন্যবলকে অসার ধর্মবলে
রূপান্তরিত করেন। এর ফলে ভারতবর্ষের বিদেশী শক্তির প্রতিরোধ
ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে এবং ভারতবর্ষ পরিণত হয় দুর্বলচিত্ত ক্লীবের
দেশে। ভারতবর্ষের সাথে যুগপৎ সনাতন বৈদিক ধর্মেরও এক
মহাসন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়। ভগবান বুদ্ধের প্রয়াণের কয়েকটি
শতাব্দীকাল পরে বৌদ্ধমত বিভিন্ন সম্প্রদায়ে এবং বিভিন্ন
তান্ত্রিকপন্থায় বিভক্ত হয়ে বিকৃতি লাভ করে। সেই বিকৃতি কিছুকিছু
ক্ষেত্রে ভয়ংকর অশ্লীল কামাচারে পর্যবসিত হয়ে পরে। সেই
বৌদ্ধমত এদেশবাসীকে এমনভাবে গ্রাস করে যে, বৈদিক ধর্মের
প্রাণকেন্দ্র কাশী (বেনারস, উত্তর প্রদেশ) পর্যন্ত নাস্তিক কুরুচিপূর্ণ
মতে ম্রিয়মান হয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে কাশী তখন পূজার অভাবে
গোচারণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এমনি এক বীভৎস সময়ে ধূমকেতুর মত
আচার্য শঙ্করের আবির্ভাব। তিনি বিভিন্ন নাস্তিক এবং অবৈদিক
অপসম্প্রদায়গুলোকে স্তব্ধ করে দিয়ে সত্য সনাতনের চিরন্তন পথে
আমাদের প্রবুদ্ধ করেন।
সনাতন ধর্ম পঞ্চমতে ও পথে বিভক্ত- সৌর, শাক্ত, শৈব, গাণপত্য এবং
বৈষ্ণব। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ পঞ্চ
মতাবলম্বীরা নিজেদের মাঝে সর্বদাই সাম্প্রদায়িক কলহে লিপ্ত
থাকত। এ গুরুতর সমস্যা সমাধানে অগ্রনায়ক হলেন আচার্য শ্রীশঙ্কর।
তিনিই প্রথম সর্বজনীন উপাসনা পদ্ধতির প্রবর্তন করেন এবং সব
দেবতার পূজার আগে পঞ্চমতের প্রতিনিধিত্বকারী পঞ্চদেবতার (সূর্য,
শক্তি, শিব, গণেশ, বিষ্ণু) পূজার বিধান দান করেন। এ বিধান
প্রাচীনকালেও ছিল কিন্তু মাঝে অবলুপ্ত হয়ে যায়। আচার্য পুনঃ এ
বিধান সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে সর্বপ্রকার
সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃঘাতী হিংসা-হানাহানী বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে আমাদের পূজায় ব্যবহৃত অধিকাংশ পদ্ধতিই তাঁর
নির্দেশিত।
আধুনিক হিন্দু জাতিকে প্রথম একটি সাংগঠনিক রূপ দেন শ্রীপাদ্
শঙ্করাচার্য। তিনিই প্রথম সনাতন ধর্ম রক্ষায় সংঘের পূর্ণাঙ্গ ধারণা
দেন। অবশ্য সংঘের ধারণা প্রাচীনকাল থেকে ছিল কিন্তু তা ছিল
বিচ্ছিন্ন, অপূর্ণাঙ্গ এবং প্রয়োগহীন। তাঁর প্রবর্তিত সংঘই ধর্ম রক্ষায়
একটি শক্তিশালী।
প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানই ‘শঙ্কর মঠ’ নামে আমাদের
কাছে পরিচিত। ‘শঙ্কর মঠ’ কোন একক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে
ভারতবর্ষের চারপ্রান্ত থেকে চারটি মঠের দ্বারা পরিচালিত হতে
থাকে। এ চারটি মঠ ছিল সনাতন ধর্ম রক্ষায় চারটি দুর্গের ন্যায়। সিন্ধু,
সৌবীর, মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমাঞ্চলের জন্য শারদা মঠ; অঙ্গ, বঙ্গ,
কলিঙ্গ, মগধ, উৎকল, গৌড়, সুক্ষ্ম, পৌণ্ড্র, ব্রহ্মপুত্র তীরবাসীসহ সমগ্র
পূর্বাঞ্চলের জন্য গোবর্দ্ধন মঠ; কুরুক্ষেত্র, কাশ্মীর, কম্বোজসহ সমগ্র
উত্তরাঞ্চলের জন্য জ্যোতি মঠ এবং অন্ধ্র, দ্রাবিড়, কর্ণাট, কেরল
প্রভৃতি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য শৃঙ্গেরী মঠ। শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য এ চার
মঠের আচার্য হিসেবে নিযুক্ত করেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম চার শিষ্যকে
সুরেশ্বর, পদ্মপাদ, তোটক এবং হস্তামলক। এ চার আচার্য চার মঠ থেকে
চার বেদের পূর্ণাঙ্গ বৈদিক জীবন বিধানের শিক্ষা দিতে থাকেন
দিকে দিকে। ফলে সনাতন ধর্ম একটি সুদৃঢ সাংগঠনিক রূপ পায়।
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য অধ্যাত্ম পথের পথিক এবং সাধারণ গৃহীদের
মাঝে ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্য চার মঠের অন্তর্ভূক্ত একদল সন্ন্যাসী
সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন যারা ‘ # দশনামী_সন্ন্যাসী ’ সম্প্রদায়
নামে খ্যাত। ফলে ভারতবর্ষে তৈরি হয় শক্তিশালী এক সন্ন্যাসী
সম্প্রদায়। ভারতবর্ষের অধিকাংশ ধর্মীয় মত, পথের সংগঠন এ চারমঠ
এবং দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত।
সন্ন্যাসীর আত্মপরিচয় এই পর্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দের বিবরণ
থেকে জানা যায় ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ’ শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের শৃঙ্গেরী
মঠের অধিভূক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতের
প্রাণপুরুষ শ্রীগৌরাঙ্গদেব দুজন গুরুর কাছে মন্ত্রদীক্ষা এবং সন্ন্যাস
নিয়েছিলেন; তাঁরা হলেন শ্রীঈশ্বরপুরী এবং শ্রীকেশব ভারতী।
তাঁরা দুজনেই শৃঙ্গেরী মঠভূক্ত সন্ন্যাসী। এমনকি যে নামে
শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমাদের মাঝে খ্যাত ‘শ্রীচৈতন্য’; এই ‘চৈতন্য’
নামটি শৃঙ্গেরীমঠভূক্ত ব্রহ্মচারী উপাধি। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যও
শঙ্করাচার্যের দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের পরম্পরাগত সন্ন্যাসী।
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই দশপ্রকার দশনামী
# সন্ন্যাসীদের_সনাতন_ধর্মপ্রচারে আলস্য ত্যাগ করে সদা সক্রিয়
থাকার আদেশ দিয়েছেন তাঁর তৈরি মঠানুশাসনে। সেখানে
ধর্মরক্ষার্থে তাঁর সকল সাঙ্গঠনিক রূপরেখা পাওয়া যায়। সেখান
থেকে দুটি শ্লোক উল্লেখ করছি:
যত বিনষ্টির্মহতী ধর্মস্যাত্র প্রজায়তে।
মান্দ্যং সন্ত্যাজ্যমেবাত্র দাক্ষ্যমেব সমাশ্রয়েৎ।।
ন জাতু মঠমুচ্ছিদ্যাদধিকারিণ্যুপস্থিতে।
বিঘ্নানামপি বাহুল্যাদেষ ধর্ম সনাতনঃ।।
(মঠানুশাসনম্ : ৫, ১১)
"হে আমার সন্ন্যাসীবৃন্দ ( দশনামী), এই সময়ে ধর্মের মহতী হানি
হয়েছে, তাই এই সময়ে সন্ন্যাসীদের ধর্মপ্রচারে মন্থরতা অবশ্য
পরিত্যাজ্য। ধর্মপ্রচারে সর্বদা দক্ষতার আশ্রয় করবে অর্থাৎ আলস্য
ত্যাগ করে ধর্মপ্রচারে সদা তৎপর হবে।
হে সন্ন্যাসীবৃন্দ তোমাদের বলছি, ধর্মপ্রচারে বিঘ্ন যতই অধিক হোক,
উপযুক্ত অধিকারী, যথোক্ত গুণসম্পন্ন আচার্য থাকলে, কেউ কখনও আমার
মঠ উচ্ছেদ করতে পারবে না। যেহেতু আমাদের ধর্মই সনাতন। অর্থাৎ
উপযুক্ত উপদেশকেই সনাতন ধর্মের রক্ষক এবং ধর্মের প্রচারে উপযুক্ত
উপদেশকের অভাব হইলে সেই মঠ অকর্মণ্য।"
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁর বত্রিশ বছরের সামান্য আয়ুতে অসংখ্য গ্রন্থ
রচনা করেছেন। তাঁর রচিত এখনো পর্যন্ত # ১৫১_খানা_গ্রন্থের সন্ধান
পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেদ এবং বেদান্ত দর্শনের ভাষ্য গ্রন্থের উপর ২২
খানা। এ ২২ খানা ভাষ্যগ্রন্থের মধ্যে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে
ধরা হয় ‘ব্রহ্মসূত্র’ ভাষ্য’কে। এ সূত্র ভাষ্যতেই তিনি তাঁর দার্শনিক
তত্ত্বকে সুদৃঢ় ভিত্তিমূলে প্রতিস্থাপিত করেন। আত্মতত্ত্ব এবং প্রকৃত
বৈদিক জীবন লাভের জন্য দিক-নির্দেশনামূলক আদেশ, উপদেশ এবং
প্রকরণ গ্রন্থের সংখ্যা ৫৪ খানা। দেবদেবীদের স্তবস্তুতিমূলক গ্রন্থ ৭৫
খানা। প্রচলিত অধিকাংশ স্তব স্তুতিই এ গ্রন্থগুলি থেকে নেয়া।
অসাধারণ তার ধ্বনিমাধুর্য এবং অসাধারণ তার পদলালিত্য।
আচার্যের জীবনের একটি প্রধান কীর্তি হল শ্রেষ্ঠ পবিত্র
মন্দিরগুলোতে ভগবদ্বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। জগন্নাথ ধামে কালযবনের
অত্যাচারকালে মন্দিরের সেবায়েত পাণ্ডাগণ জগন্নাথ বিগ্রহের উদর
প্রদেশ স্থিত রত্নপেটিকা চিল্কা হ্রদের তীরে ভূগর্ভে লুকিয়ে
রাখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কালক্রমে উক্ত স্থানের লোকেরা ভুলে
যান রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে। আচার্য শ্রীশঙ্কর যোগবলে
জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন এবং
পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। বদরিকাশ্রমে নারায়ণ বিগ্রহও তিনি
অনুরূপভাবে প্রকাশিত করেন।
আচার্য শ্রীশঙ্কর ছিলেন যুক্তিবাদিতার এক অত্যুজ্জ্বল বিগ্রহ। তিনি
যুক্তি বিহীন কোন কথা বলতেন না। যে কথাই বলতেন তার পিছনে
থাকতো তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি। সে অকাট্য যুক্তির জাল ছিন্ন করা ছিল
দুঃসাধ্য। কারণ তিনি ছিলেন সত্যে প্রতিষ্ঠিত। তাই তিনি যা
বলেছেন তাই সত্যে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি বৈদিক ধর্মের
পুনরুত্থান ঘটালেন শুধুমাত্র যুক্তি, মেধা, প্রজ্ঞার সহায়তায়। না কোন
রক্তপাত না কোন হানাহানি, না কোন রাজশক্তির ক্ষমতার
অপপ্রয়োগে। কোন কিছুই ধ্বংস করেন নি, করেছেন সৃষ্টি, পুনঃপ্রবর্তন।
বশিষ্ট-ব্যাসের ন্যায় মেধা প্রজ্ঞার সাথে অসাধারণ সারল্য, লাবণ্য
ছিল তাঁর সারা দেহে, তাই তাঁকে দেখে, তাঁর কথা শুনে মুগ্ধ না হয়ে
উপায় ছিল না।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের কথা ভাবলে
গা রোমাঞ্চিত হয়, ভাবি শ্রীশঙ্করাচার্য কি একজন, না শত সহস্রজন!
মাত্র বত্রিশ বছর, মহাকালের কাছে কতটুকু সময়! এ সময়ের মধ্যে একজন
ব্যক্তি এত অসাধারণ কীর্তি কি করে করলেন; এই সামান্য সময়ের মধ্যে
কিভাবে তিনি এত জনপদে ঘুরে বেরিয়েছেন; কি কৌশল অবলম্বন করে
কোটি কোটি মানুষকে সনাতন ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে
এসেছেন; এত ব্যস্ততার মধ্যেও কিভাবে তিনি ১৫১টা অমূল্য গ্রন্থের
রচনা করেছেন; এবং এত সুসংবদ্ধ, অনন্য, অভূতপূর্ব সাংগঠনিক দক্ষতা
তিনি কোথায় পেলেন?
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের সমতুল্য ব্যক্তি ভারতবর্ষে তো বটেই পৃথিবীর
ইতিহাসে বিরল। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের
যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারিনি। আচার্যের জীবনে আমরা দেখি যা
কিছু সনাতন ধর্মের সমৃদ্ধিবাচক কাজ হয়েছে তা তাঁর জীবৎকালেই
হয়েছে। তাঁর অন্তর্ধানের পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং
যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে চারমঠ আচার্যের জীবৎকালের ন্যায় নেতৃত্ব
দিতে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার কারণেই অনন্য অসাধারণ কাজের পরেও
আচার্য শ্রী শঙ্করকে আমরা ভুলতে বসেছি। আজ শ্রীপাদ্
শঙ্করাচার্যের উক্তি বিভিন্ন গুরু এবং গুরুরূপী ভগবানগণ (!) নিজেদের
নামে চালিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। কারণ এ গুরু ব্যবসা করা
কুম্ভীলকদের ধরবে কে? এর জন্য আমরাও কম দায়ী নয়। যতদিন যাচ্ছে
তত বেশি করে আমরা মূলবৃক্ষকে ছেড়ে শাখা প্রশাখায় যেয়ে বসছি
এবং তাকেই মূলবৃক্ষ বলে অভিমান করছি। সনাতন বৈদিক রাজপথ ছেড়ে
কতগুলো অপরিচ্ছন্ন অলিগলিতে যেয়ে পথহারা পথিক হয়ে বসে আছি।
অলিগলিতে চলতে চলতে আমরা টেরও পাচ্ছি না যে আমরা প হাইব্রীড ফসলে সারা দেশ ছেয়ে যাচ্ছে।
ভণ্ডদের কারণে  অসংখ্য মত পথের জঞ্জালে আমাদের যুবকসমাজ
পথহারা, ভ্রান্ত, বিপথগামী হয়ে সনাতন ধর্ম, সমাজ এবং
পারিবারিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।
পরিণামে কেউ হচ্ছে মানসিক হীনমন্য, কেউ বেছে নিচ্ছে ধর্মান্তর,
কেউবা হয়ে যাচ্ছে ঘোরতর নাস্তিক।
দক্ষিণভারতের একটি দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেয়ায়
জন্মগতভাবে শঙ্করাচার্যের মধ্যে জাতিবর্ণভেদের সংস্কারটি
ছিল। শিক্ষা দেন সকল জীবজগৎ আদতে একই ব্রহ্মের রূপ থেকে
রূপান্তর মাত্র ; অর্থাৎ প্রত্যেকটি জীবের মাঝেই একই ব্রহ্ম
বিরাজ, এই অখিল ব্রহ্মাণ্ড চিন্মাত্ররূপে বিস্তৃত, আমা কর্তৃক
ত্রিগুণময়ী অবিদ্যা দ্বারা এ অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কল্পিত হয়েছে, যে
ব্যক্তির এইপ্রকার দৃঢ বুদ্ধি সুখময় নির্মল ব্রহ্মে অটলা থাকে
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্য কিভাবে সকল মানবকুল নির্বিশেষে কেমন
# একটি_ঐক্যবদ্ধ_বৈশ্বিকজাতির_কল্পনা করেছেন তার একটি অনন্য
উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর রচিত 'অন্নপূর্ণা স্ত্রোত্রম্' নামক গ্রন্থে। এ
স্তোত্রের শেষ শ্লোকে তিনি উদাত্তস্বরে বলেছেন, তাঁর মা হলেন
জগতের জননী পার্বতী এবং পিতা হলেন জগতের পিতা মহেশ্বর, আর
জগতের জনকজননীর সন্তান সকল অর্থাৎ জীবসকল হলো পরমবন্ধু ; স্বর্গ,
মর্ত ও পাতাল এ ত্রিভুবন জুড়েই হলো তাঁর স্বদেশ।
মাতা মে পার্ব্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বরঃ ।
বান্ধবাঃ শিবভক্তাশ্চ স্বদেশো ভুবনত্রয়ম্ ।।
(অন্নপূর্ণা স্ত্রোত্রম্ :১২)
জগতের মাতা ভগবতী পার্বতী হলেন আমার মা এবং জগতের পিতা
দেব মহেশ্বর হলেন আমার পিতা ; আমার পরম বান্ধব হলেন জগতের
পিতামাতার ভক্তগণ এবং স্বর্গ, মর্ত ও পাতাল এ ত্রিভুবন জুড়েই আমার
স্বদেশ।
আজ নিমজ্জমান হিন্দু জাতিকে রক্ষার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন
শ্রীপাদ্ শঙ্করাচার্যের ন্যায় তেজদীপ্ত নায়ক, সংগঠক, ব্রহ্মবাদী
এবং ঈশ্বরে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী মহামানবের। সেই পারবে হিন্দু
সমাজের অনাকাঙ্ক্ষিত জঞ্জালকে বিদূরিত করে এক ঐক্যবদ্ধ সুসংবদ্ধ
জাতিতে
পরিণত করতে। তাই সেই নতুন এক সূর্যোদয়ের আকাঙ্ক্ষী হয়ে, সেই
মহামানবের প্রতীক্ষায় আছি আমরা সকলে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের ভাষায়-
ওই মহামানব আসে,
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে॥
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক-
এল মহাজন্মের লগ্ন।
আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত
ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।
উদয়শিখরে জাগে ‘মাভৈঃ মাভৈঃ’
নবজীবনের আশ্বাসে।
সনাতন ধর্মকে নিয়ে অহেতুক সমালোচনা কাম্য নয়,
ইসলাম ধর্মের লোকদের মাঝে কেউ কেউ সনাতন ধর্মের ঈশ্বরের একত্ববাদ এবং মূর্তি পূজা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ।কেউ কেউ হিন্দু ধর্ম কোন ধর্ম নয়, স্রষ্টার একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম এবং পবিত্র কোরআন নাযিল হওয়ার পর অন্য ধর্মগ্রন্থ বাতিল এবং ইসলাম ধর্ম নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী,সনাতনধর্মের লোক  নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী নয় বলে থাকেন ।এতদবিষয়ে সনাতন ধর্মের লোকদের মাঝে সন্দেহের বা খটকার সৃষ্টি করা হয় ।আমি সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ পবিত্র বেদের আলোকে আলোচনায় ব্রতী হলাম ।সনাতন ধর্মের মহাবাক্য, একমেবাদ্বিতীয়ম (ছান্দোগ্য উপনিষদ-৬|২|১)। ঋকবেদে বলা হয়েছে, একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি (১|১৬৪|৪৬)। অর্থাৎ সদ্বস্তু এক,বিপ্ররা বহু নামে অভিহিত করে থাকেন ।সুতরাং, পবিত্র বেদ নিখুঁত একত্ববাদের ধারক।ব্রহ্মসূত্রে বলা হয়েছে, একং ব্রহ্ম, দ্বৈত নাস্তি নাহিনা নাস্তি,কিঞ্চন ।অর্থাৎ, ব্রহ্ম বা পরমেশ্বর এক, তার মতো কেউ নেই, কেউ নেই, সামান্য ও নেই ।কেউ কেউ ব্রহ্ম আর ব্রহ্মাকে এক করে ফেলেন ।ব্রহ্ম হলেন স্রষ্টা এবং ব্রহ্মা হলেন ব্রহ্মের সৃষ্ট ।ব্রহ্মার স্ত্রীলিঙ্গ ব্রহ্মাণী আছে ।ব্রহ্মের কোন লিঙ্গান্তর নেই ।ব্রহ্মের স্বরূপ ওঁ যার কোন লিঙ্গান্তর বা বচনান্তর নেই ।সনাতন ধর্মে র লোক বহুদেবতাবাদী, বহু ঈশ্বরবাদী নন ।ঈশ্বর ও দেবতা এক নন।দেবতা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এক একটি গুণের প্রতীক বা শক্তি ।আর সনাতন ধর্মের লোক মূর্তি পূজা করেন না,মূর্তিতে ঈশ্বর বা দেবতার পূজা করে থাকেন ।যদি মূর্তিকে ঈশ্বর ভেবে পূজা করা হতো, তাহলে পূজার পর মূর্তিকে বিসর্জন না দিয়ে বা গাছ তলায় না রেখে ঘরেই রাখা হতো ।দেবতা পূজা করে ঈশ্বরের সাথে অংশীদারিত্ব করা হয় সে ধারণা সঠিক নয় ।ঈশ্বর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা ,আর দেবতারা ঈশ্বর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ।ঈশ্বর এক একটি কর্মভার একেকজন দেবতার উপর অর্পণ করেন ।সকল দেবতার পূজা সমাপন করে বিষ্ণুর নামে সমর্পণ করা হয় ।ঈশ্বর সর্বব্যাপী বলে ঈশ্বরের গুণবাচক নাম বিষ্ণু ।সনাতন ধর্মের লোক পৌত্তলিক নয়,প্রতিমা পূজক ।ইসলাম ধর্ম প্রচারের আগে আরববাসী পৌত্তলিক ছিল ।তাদের পূজিত দেবতার সাথে সনাতন ধর্মের দেবতার কোন মিল নেই ।সনাতন ধর্মের দেবতা কালী, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী দেবতার নামে কোন দেবতা আরববাসীর ছিল না ।আরববাসীর লোকদের নামের সাথে সনাতন ধর্মের লোকদের নামের কোন মিল নেই ।আবু তালেব, আব্দুল মোতালেব, ওসমান, আলী,আবুবকর( রাঃ),আমেনা, ইত্যাদি নাম সনাতন ধর্মের লোকদের নেই ।।কাজেই  ,পৌত্তলিক আরববাসীকে সনাতন ধর্মের লোক বলে অভিহিত করা যথাযথ নয়। হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ) এর নির্যাতনকারী সীমার ও এজিদ এর নাম সনাতন ধর্মে নেই ।হিন্দু ধর্ম একটি ধর্ম নয়,সেই সমালোচনার বিরূপ সমালোচনা না করে বলছি ,হিন্দুধর্ম কোন ধর্ম নয়, আমাদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম ।সনাতন মানে শাশ্বত ও চিরন্তন ।হিন্দু একটি সম্প্রদায় যারা সনাতনী নামে পরিচিত ।হিন্দু তথা সনাতনীদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম ।যেমন মুসলমান একটি সম্প্রদায় এবং তাদের ধর্মের নাম ইসলাম ধর্ম ।ইসলাম ধর্মের লোকদের কেউ কেউ বলে থাকেন, কোরআন নাযিল হওয়ার পর অন্য ধর্ম গ্রন্থ বাতিল হয়ে গিয়েছে ।আমার মতে, সনাতন ধর্ম যেহেতু ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়,কাজেই তাদের ধর্ম গ্রন্থ নাযিল হওয়ার পর সনাতন ধর্মের ধর্ম গ্রন্থ বাতিল হওয়ার প্রশ্ন উঠে না ।ইসলাম ধর্মের মোট একশত চারখানা আসমানী কিতাব এবং প্রধান আসমানী কিতাব চারখানা ।একশত আসমানী কিতাবের মধ্যে সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদসহ কোন ধর্ম গ্রন্থ থাকার কথা নয় ।কাজেই, বাতিল হওয়ার প্রশ্ন কী যুক্তিযুক্ত? ইহুদি ও খ্রিস্টান আহেলে ইসলাম বা আহেলে কিতাব ।আহলে কিতাব হলো প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের অনুসারী ।তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরীত ও ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে থাকলে তারা তা বাতিলের দাবি করতে পারেন, সনাতন ধর্মের কোনো ধর্ম গ্রন্থ নয় ।সনাতন ধর্মের সাথে ইসলাম ধর্মের কোনো বিরোধ নেই, সর্ব ক্ষেত্রে মিল ও  নেই ।স্ব স্ব ধর্মের লোকের কাছে স্ব স্ব ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম ।কোনো ব্যক্তিকে সমালোচনা করা যায়, কোন ধর্মকে সমালোচনা করা সৃষ্টির সেরা মানবজাতির ধর্ম নয় ।সনাতন ধর্মের কোনো প্রবর্তক নেই, স্বয়ং ঈশ্বর সেই ধর্মের স্রষ্টা ।বেদের ঋষিগণ প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদের দ্রষ্টা।বেদ ঈশ্বরের বাণী ।তাই, বেদ বাতিলের প্রশ্নই উঠে না ।পবিত্র বেদে ঈশ্বর নিরাকার ।তবে, দ্রষ্টা ঋষিগণ কর্তৃক বেদের কোন জায়গায় ঈশ্বরের সাকার রূপের বর্ণনা পাওয়া যায় । যজুর্বেদে বলা হয়েছে, তিনি ( পরমাত্মা) সর্ব ব্যাপক, সর্ব শক্তিমান, শরীর রহিত,রোগ রহিত, জন্ম রহিত, শুদ্ধ,নিষ্পাপ,      সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী, দুষ্টের দমনকর্তা ও অনাদি।তিনি তাঁর শাশ্বত প্রজা জীবের জন্য যথাযথ ফলের বিধান করেন(৪০|৮)।, এখানে ঈশ্বরের নিরাকারত্ব বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে ।ঋকবেদে আরো বলা হয়েছে, পুরুষের অনন্ত মস্তক, অনন্ত নয়ন,অনন্ত চরণ।তিনি বিশ্ব জগতকে- সর্বতোভাবে পরিব্যাপ্ত করে ও জীবদেহে নাভির দশাঙ্গুল উর্দ্ধে হৃদয়মধ্যে অবস্থিত আছেন ১০|৯০|১)।এখানে কিছুটা সাকার রূপের ইংগিত পেলেও পরোক্ষভাবে নিরাকারত্ব প্রকাশ পেয়েছে ।বলা হয়েছে, ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ যশঃ ।অর্থাৎ, তার কোনো প্রতিমা নেই যাঁর নাম মহৎ যশ আছে ( যজুর্বেদ-৩২|৩)।কেউ কেউ প্রতিমা শব্দকে প্রতিম হিসেবে ধরে নিয়ে তাঁর তুলনা নেই বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ।যাহোক ঈশ্বরের সাকার নিরাকার উভয় ব্যাখ্যা থাকলেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয় নাই ।তাই সনাতন ধর্মের লোকের ঈশ্বরকে সাকার নিরাকার বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে মাইনাস করার সুযোগ নেই ।সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন সর্ব প্রথম কোরান শরীফ বাংলা  ভাষায় অনুবাদ করেন ।সনাতন ধর্মে যদি সারবত্তা না থাকতো অথবা সনাতন ধর্ম কোনো ধর্ম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতেন ।সনাতন ধর্ম আদি ধর্ম।সনাতন ধর্ম শাশ্বত ও চিরন্তন যার নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে ।সনাতন ধর্মের কোনো ধর্ম সভায় অন্য ধর্মের সমালোচনা করা হয় না ।নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে অন্য ধর্মের সমালোচনা ঠিক নয় ।কোনো ধর্ম সম্পর্কে জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে সমালোচনা করা প্রকৃত ধার্মিকের পরিচয় নয়।সনাতন ধর্ম এমন একটি ধর্ম যা সব সময় শুধু সনাতন ধর্মের লোকদের জন্য নয়,সারা বিশ্ববাসীর মঙ্গল কামনা করে ।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থের আলোকে অনেক কবিতা,গান ও শ্যামা সংগীত লিখেছেন ।তিনি ইসলাম ধর্মের গজল লিখার পাশাপাশি সনাতন ধর্ম নিয়ে লিখতে ভুল করেননি ।যাহোক, সনাতন ধর্মের মতো কিছু সংখ্যক প্রজ্ঞাবান উদারপন্থী লোকও ইসলাম ধর্মে রয়েছেন যারা অন্য ধর্মের সমালোচনা করেন না ।তাদের কাছে সবিনয়ে অনুরোধ, তারা যেন সনাতন ধর্মের সমালোচনাকারীদেরকে প্রজ্ঞার বলে বুঝিয়ে সনাতন ধর্মকে অহেতুক সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করেন । ।কাউকে আঘাত করার জন্য আমার লিখার উদ্দেশ্য নয়, অকারণে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ও সনাতন ধর্ম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনার নিরসনের ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র ।আমার সতীর্থ সনাতনী ভাইবোনদের কাছে বিনীত অনুরোধ, আমার লিখার সহমত পোষণ করতে যেয়ে ইসলাম ধর্মকে আঘাত না করে মন্তব্য করবেন।পরিশেষে বলি,সনাতন ধর্মকে নিয়ে অহেতুক সমালোচনা কাম্য নয় । ।আমার লিখাকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শন করার বাসনা রইলো । আমার লিখার ভুল ভ্রান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থী ।

চার বর্ণের অশৌচ বিভ্রান্তির সমাধান

চার বর্ণের অশৌচ নিয়ে আজও বিভ্রান্তির শেষ নেই ।আজকাল কেউ কেউ সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ পালনের পক্ষপাতী ।এর সমর্থনে গরুড় পুরাণের পূর্ব খণ্ডের ৬|১০ও ৬|৪০নং এবং মনুসংহিতার ৫|৫৯নং শ্লোকের উদ্ধৃতি দেন।বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ বলেন, সপিণ্ডদিগের মরণাশৌচ দশাহ; যারা নিপূণভাবে শুদ্ধি আকাঙ্ক্ষা করেন তারা পুত্রাদি  জননে ও দশাহাশৌচ পালন করেন (৬|১০)আরো বলা হয়েছে,শ্রীকৃষ্ণ বলেন,  যে প্রেতের উদ্দেশ্য একাদশ দিনে বৃষোৎসর্গ না হয়,তার উদ্দেশ্য শত শত শ্রাদ্ধ করলে ও প্রেতত্ব বিমুক্ত হয় না ৬|৪০)।এখানে বক্তা শ্রীবিষ্ণু এবং শ্রোতা ব্রাহ্মণ কশ্যপ মুনির সন্তান বিষ্ণুভক্ত গরুড় ।উল্লেখ্য,গরুড় পুরাণে উল্লিখিত শ্রীকৃষ্ণ হলেন চতুর্ভুজা শ্রীবিষ্ণু ।কারণ, বিষ্ণুর সহস্র নামের এক নাম কৃষ্ণ ।যাহোক, তাদের ভাষায় ভগদ্বাক্য অলঙ্ঘনীয় ।আমি ও তাই বলি।এ শ্লোকগুলো কেবলমাত্র বিপ্রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ।কারণ উক্ত শ্লোকে' সর্বেষামেব বর্ণানাং ' অর্থাৎ সর্ববর্ণের উল্লেখ নেই ।তাছাড়া গরুড়ের জিজ্ঞাসার উত্তরে ভগবান বিষ্ণু অন্তেষ্টি ক্রিয়া থেকে শ্রাদ্ধ ক্রিয়া পর্যন্ত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, বিপ্রগণ বিধি অনুসারে সমস্ত কার্য করবেন ( উঃখঃ ৫|১৮০)। এই কথা বলার পর ষষ্ঠ অধ্যায়ের ১০নং শ্লোক পর্যন্ত কোন বর্ণের উল্লেখ না থাকায় তা বিপ্রদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে তা শতভাগ নিশ্চিত ।গরুড় পুরাণেই একাধিকবার চার বর্ণের ভিন্ন ভিন্ন অশৌচ বিষয়ে বলা হয়েছে ।গরুড় পুরাণের পূর্ব খণ্ডের ৫০|৮১-৮৩,১০৬|১৯,২২৬|৩৮নং শ্লোকে চার বর্ণের আলাদা আলাদা অশৌচ বর্ণনা করা হয়েছে । এবিষয়ে এখানে নিন্মে প্রদত্ত ভিডিও আলোচনাটি দেখলে আরো ক্লিয়ার হতে পারবেন, 

  
গরুড় পুরাণের পূর্ব খণ্ডের ১০৭|১০-১১নং শ্লোকে অশৌচ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ব্রহ্মবিৎ ব্রাহ্মণ প্রেতাশৌচ ও জননাশৌচ হলে তিন দিনে শুদ্ধি লাভ করবেন ।এরূপ ব্রহ্মবিৎ ক্ষত্রিয় দশ দিনে, ব্রহ্মবিৎ বৈশ্য বারদিনে এবং ঐরূপ শূদ্র ত্রিশ দিনে শুদ্ধি লাভ করবেন ।যিনি জাতি মাত্র বিপ্র তিনি দশ দিনে, জাতিমাত্রে ক্ষত্রিয় বার দিনে, জাতিমাত্র বৈশ্য পনেরো দিনে এবং জাতিমাত্র শূদ্র এক মাসে শুদ্ধ হবেন ।কাজেই, দেখা যায়, শূদ্র ব্রহ্মবিৎ হলে ও অশৌচের শিথিলতা নেই অর্থাৎ অশৌচ ত্রিশ দিন ।তাছাড়া গরুড় পুরাণের আদি বক্তা হরি বা বিষ্ণু ।তাই, সকল শ্লোক শ্রীহরি কর্তৃক সমর্থিত ।একটা জিনিস লক্ষ্য করুন, গরুড় পুরাণে শ্রীবিষ্ণুর বাচনীক বৃষোৎসর্গ না হলে শত শত শ্রাদ্ধ করলে ও প্রেতত্ব বিমুক্ত হয় না উল্লেখ থাকলেও বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ করার বিষয়ে কোন বক্তব্য সভা সমিতিতে দেয়া হয়নি ।কেবল এগারো দিনে শ্রাদ্ধ প্রতিষ্ঠিত করতে উক্ত শ্লোকের উদ্ধৃতি দেয়া হয় ।বিষ্ণু পুরাণে বলা হয়েছে, সপিণ্ডের জননে ও মরণে ব্রাহ্মণের অশৌচ দশাহ, ক্ষত্রিয়ের দ্বাদশাহ, বৈশ্যের পঞ্চদশাহ এবং শূদ্রের একমাস (১৩|১৯,১১/১-৩)।বিষ্ণু পুরাণের শ্লোকগুলো গরুড় পুরাণের চার বর্ণের অশৌচ বিষয়ে শ্লোকগুলোকে পূর্ণ সমর্থন করে এবং বিপ্রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শ্লোকেরও সমর্থন দেয় ।মনুসংহিতার ৫|৫৯নং শ্লোকটি যে ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা ৫/৮৩নং শ্লোকের দ্বারা প্রমাণিত হয় ।সরলার্থ ও তাৎপর্যে বলা হয়েছে, সপিণ্ডের মৃত্যু হলে নির্গুণ ব্রাহ্মণের দশ দিন এবং গুণের তারতম্য অনুসারে চারদিন, তিন দিন কিংবা এক অহোরাত্র মাত্র অশৌচ হবে ।ব্রাহ্মণের বেদ জ্ঞান ও অগ্নিচর্যা বিবেচনা করে অশৌচ কালের এরকম তারতম্য হয়( ৫/৫৯)।উক্ত শ্লোকে ব্রাহ্মণ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও সর্ববর্ণের উল্লেখ না থাকায় ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রেই বুঝতে হবে ।১০০নং শ্লোকে বলা হয়েছে, হে দ্বিজ শ্রেষ্ঠগণ! সপিণ্ডের মৃত্যুতে অন্যান্য সপিণ্ডের পক্ষে শৌচ লাভ করার যে সব বিধান আছে, তা তোমাদের বললাম ।এখন অসপিণ্ড মরণে যে রকম অশৌচ হয়, তা আপনারা এবার শুনুন।এখানে দ্বিজ শ্রেষ্ঠ বলতে ব্রাহ্মণকে বুঝানো হয়েছে ।তাছাড়া ৮৩নং শ্লোকে বলা হয়েছে, উপনীত সপিণ্ডের মরণে বা জননে ব্রাহ্মণেরা দশ দিনে শুদ্ধ হন, ক্ষত্রিয়েরা দ্বাদশ দিনে, বৈশ্যেরা পঞ্চদশ দিনে এবং শূদ্র এক মাসে শুদ্ধ হন ।৫৯নং শ্লোকে গুণের তারতম্য অনুসারে তিন দিন ও এক অহোরাত্র অশৌচের কথা বলা হয়েছে ।যে ব্রাহ্মণ সাগ্নিক ও স্বাধ্যায় পাঠে নিরত তাঁর একদিন অশৌচ হয় ।নিরগ্নি ও কেবলমাত্র স্বাধ্যায় পাঠে নিরত ব্রাহ্মণের তিন দিন এবং জাতিমাত্রে ব্রাহ্মণের দশদিন অশৌচ হয় ।একাহাচ্চুদদ্ধতে বিপ্রোহযাগ্নি বেদ সমন্বিতঃ।ত্র্যহং কেবল বেদস্তুদ্বিহীন দশভির্দ্দিনৈঃ।।কাজেই, ৫৯নং শ্লোকটি কেবল ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা প্রমাণিত ।সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ এর সমর্থনে, 'এই শ্লোকের উদ্ধৃতি  দেয়া হয়, ' সর্ব্বেষামেব বর্ণানাং সূতকে মৃতকে তথা ।দশাহাচ্ছুদ্ধিরেতষামিতি শাতাতপঃ অব্রবীৎ।।মিতাক্ষরায় উক্ত অঙ্গিরা বচন ।উক্ত শ্লোকে বুঝা যায় অঙ্গিরা ঋষি শাতাতপঃ ঋষির বরাত দিয়ে বলেছেন সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ ।এই শ্লোকটির কোন শ্লোক সংখ্যা উল্লেখ নাই।তাছাড়া অঙ্গিরা সংহিতায় বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ দশ দিনে শুদ্ধ হন,ক্ষত্রিয় বার দিনে, বৈশ্য এক পক্ষে  এবং শূদ্র এক মাসে শুদ্ধ হন (৫১নং শ্লোক)।অন্যত্র বলা হয়েছে, শাতাতপ ঋষি বলেছেন, ক্ষত্রিয় এগার দিনে, বৈশ্য বার দিনে এবং শূদ্র বিশ দিনে শুচি হবে ( লেখকঃ জিতেন্দ্রিয় দাসের শ্রাদ্ধ তত্ত্ব বিচার- ইসকন) উক্ত লেখক প্রাগোক্ত সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ পালনের শ্লোকটি উপহার দিয়ে সর্ববর্ণেদশাহাশৌচ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন ।কিন্তু আঙ্গিরা ও শাতাতপার আলোচ্য শ্লোক থেকে আপনারাই বিচার করুন কোনটা সঠিক হবে?ইসকন প্রকাশিত :শ্রীল রূপ গোস্বামী প্রভুপাদ বিরচিত  ভক্তি রসামৃত গ্রন্থে অষ্টম অধ্যায়ে বর্জনীয় অপরাধ বিষয়ে বলা হয়েছে, দূষিত অবস্থায় মন্দিরে প্রবেশ করা উচিত নয় (বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী পরিবারের পরিবারে কারো মৃত্যু হওয়ার পর সমস্ত পরিবারই কিছু দিনের জন্য অশুচি হয়ে যায় ।ব্রাহ্মণদের এই অশৌচ অবস্থা বারো দিন থাকে ।ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের পনেরো দিন এবং শূদ্রের জন্য ত্রিশ দিন ।তাহলে বিচার করুন,জিতেন্দ্রিয় দাসের সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ কতটুকু গ্রহণযোগ্য তাছাড়া অত্রি সংহিতার"৮৫নং,যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতার ৩|২২, উশন সংহিতার ৬|৩৪,সংবর্ত্ত সংহিতার ৩৮নং শ্লোক, পরাশর সংহিতার ৩|৪, শংখ সংহিতার১৫|২-৩,গৌতম সংহিতার চৌদ্দ অধ্যায়ে, কুর্ম পুরাণের ২৩|৩৮, পদ্ম পুরাণ,ব্রহ্ম পুরাণ, অগ্নি পুরাণ, মার্কণ্ড পুরাণ, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ,মৎস পুরাণসহ অসংখ্য পুরাণ ও সংহিতায় চার বর্ণের আলাদা আলাদা অশৌচ বর্ণনা করা হয়েছে ।এতগুলো পুরাণ ও স্মৃতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই ।তাছাড়া কেউ কেউ বার দিন, আবার কেউ পনেরো দিন অশৌচ পালন করে শ্রাদ্ধাদি কার্য করে থাকেন ।সুবিধাবাদী ব্যবস্থাপকরা ব্যবস্থা  দিয়ে থাকেন ।সর্ববর্ণে দশাহাশৌচ শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত থাকলে বারো দিন ও পনের দিনের অশৌচ পালনের সিদ্ধান্ত দিতেন না ।কেউ কেউ বলেন, বর্তমান যুগে মানুষের চাকুরি বা অন্যান্য  সমস্যার কথা বিবেচনা করে অশৌচ কমিয়ে দেন।শাস্ত্রীয় বিধান পরিবর্তন করার কী সুযোগ আছে সভা সমিতি করে ।তবে অশৌচ বিধি যদি শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে তাহলে তো তিন দিনে বা একদিনে শ্রাদ্ধ করা যায় ।আর শূদ্রের শ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণ না আনলেও তো হয় ।মনু বলেছেন, স্ত্রী ও শূদ্র অমন্ত্রক শ্রাদ্ধ করতে পারবে ।ব্রাহ্মণের ব্যবসায় হাত দিলাম ।একথা বললাম এজন্য, আজও ব্রাহ্মণরাই তো কেউ কেউ অশৌচ থাকতে, কেউ অশৌচান্তে শ্রাদ্ধ ক্রিয়া করাচ্ছেন ।সকল ব্রাহ্মণ শাস্ত্রীয়ভাবেএক মতে নিজের ও যজমানের মঙ্গলের কথা ভাবেন, ইহকাল ও পরকালের কথা ভাবেন ।আমি কাউকে উপদেশ দিচ্ছিনা ।উপদেশ দেবার মতো ক্ষমতা ও আমার নেই ।সমাজের দায় বদ্ধতা থেকেলও ফেইসবুক বন্ধুদের প্রশ্নের আলোকে আমার লিখা ।বর্তমান যুগের পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে অশৌচ কমানোর বিষয়ে মত প্রকাশ করতে প্রবল ইচ্ছে থাকলে ও শাস্ত্র পাঠ করে শাস্ত্রের বাহিরে সিদ্ধান্ত দিতে বিবেক বাধা দেয় ।যাহোক, শাস্ত্রের আলোকে বলি ,ব্রাহ্মণদের অশৌচ দশদিন, ক্ষত্রিয়র বার দিন, বৈশ্যের পনেরো দিন এবং শূদ্রের একমাস ।আর শাস্ত্রের আলোকে সিদ্ধান্ত নেবার ভার আপনাদের সর্বোচ্চ আদালত বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম ।সুদীর্ঘ লিখায় ভুল ভ্রান্তি র জন্য ক্ষমা প্রার্থী ।
 অশৌচের প্রয়োজনীতা কি?  শাস্ত্রীয় কিছু দিকনির্দেশ, 
স্মৃতোক্ত অশৌচ বিধি, অপূর্ব্ববিধির অন্তর্গত। বৈদিক সদাচারে স্মরণাতীত কাল হইতে, সনাতন সমাজে এই বিধি মর্য্যাদার সাথে আচরিত হয়। অপূর্ব্বতা বলেই, এই বিধি প্রশ্নাতীত-সংশয়াতীত মান্যতায় অঙ্গীকৃত। অন্যথায়, বিধির প্রযোজক কারন স্বীকৃত হলে, অপূর্ব্বতার হানি হয়। ইহা শাস্ত্রসিদ্ধান্ত।


সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রাকৃত লৌকিক যুক্তশীলতায়, এতদ্‌বিষয়ে কার্য্যকারন সম্পর্কের ব্যাখ্যায় স্বীকৃত প্রত্যক্ষ, অধিক হর্ষ-বিষাদজনিত কারনে অন্তঃকরন চঞ্চলতা প্রাপ্ত হয়। এই চঞ্চলতা বশতঃ ক্রিয়া-কর্ম্মাদিতে কাঙ্খিত একাগ্রতা-নৈপুন্যতা স্বাভাবিক ব্যহত হয়। তাৎক্ষণিক ভাবজাত প্রবৃত্তি, বৈদিক কর্ম্মানুষ্ঠানের নিয়ামক রূপে স্বীকৃত নয়। অতঃ শাস্ত্রীয় অনুশাসনে, সবিশেষ আনন্দ-শোক-উদ্বেগ জনিত মনবৈকল্য প্রশমনে বর্ণধর্মানুসার আত্মীকৃত শিক্ষাতারতম্যে, অশৌচ কালভেদ সূচীত হয়। অশৌচ কাল পরিমাপ প্রতীকি। ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রমীর পালনীয় দশাহ অশৌচ কাল, চতুর্বেদ ও ষড়বেদাঙ্গের সন্মিলিত শিক্ষার রূপকে গৃহীত। ব্রাহ্মণ শ্রৌতশিক্ষায় সাময়িক মানষিক হর্ষ-বিষাদাদি অবস্থা অতিক্রমন করে স্ববৃত্তিতে যথাযথ পুণঃস্থিতি প্রাপ্ত হয়। ক্ষত্রিয় বর্ণাশ্রমী আদিত্যধর্মী। আদিত্য যেরূপ দ্বাদশ রাশিচক্র অতিক্রমনান্তর সূচনাদশায় প্রত্যাবর্তন  করে, অনুরূপ, দ্বাদশাহ অশৌচান্তে ক্ষত্রিয় পুনঃ স্ববৃত্তিতে অধিকার লাভ করে। ধান্যাদি শষ্য যেরূপ ন্যুনাধিক পঞ্চদশ সপ্তাহে বীজ হতে বীজে পরিবর্তিত হয়, তদনুরূপ বৈশ্য বর্ণাশ্রমী পঞ্চদশাহ অশৌচান্তে পূর্ব্বাবস্থা প্রাপ্ত হয়। আর, যেহেতু শুদ্র বর্ণাশ্রমীর স্বাধীন বৃত্তি অস্বীকৃত, সেক্ষেত্রে মনবৃত্তির সাধারণ গতি চন্দ্রসাম্যে গৃহীত। চন্দ্র যেমন ত্রিশতিথিগত পক্ষাবর্তনে সূচনাতিথি প্রাপ্ত হয়, শুদ্র অনুরূপে ত্রিশাহ অশৌচান্তে স্ববৃত্তস্থতা প্রাপ্ত হয়।৷
৷৷৷৷৷৷৷৷৷  ৷ (লেখক শ্রী  মানিক চক্রবর্তী )৷৷৷৷৷৷  

Wednesday, February 8, 2017

বেদ হিন্দুদের প্রাচীনতম ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম। এর চারটি মূল অংশ রয়েছে: ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সাম বেদ এবং অথর্ব বেদ। বেদ (সংস্কৃত véda वेद " জ্ঞান ") প্রাচীন ভারতে লেখা হয়েছে। তারা সংস্কৃত সাহিত্যের পুরনোতম স্তর সংগঠিত করে হিন্দুধর্মের উপর।

এটি একটি ধর্মীয় গ্রন্থ হিন্দুদের। হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী, বেদ একটি মানবিক গ্রন্থ নয়। বৈদিক মন্ত্রগুলো হিন্দুদের অনুষ্ঠান, ধর্মীয় কাজ এবং অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজে পড়া হয়। ‘বেদ’ শব্দের বু্ৎপত্তিগত অর্থ জ্ঞান। যার অনুশীলনে ধর্মাদি চতুর্বর্গ লাভ হয় তা-ই বেদ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বেদকে অপৌরুষেয় অর্থাৎ ঈশ্বরের বাণী বলে মনে করা হয়। এটি কতগুলি মন্ত্র ও সূক্তের সংকলন। বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ প্রমুখ বৈদিক ঋষি জ্ঞানবলে ঈশ্বরের বাণীরূপ এসব মন্ত্র প্রত্যক্ষ করেন। তাই এঁদের বলা হয় মন্ত্রদ্রষ্টা। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলাও ছিলেন, যেমন বিশ্ববারা, লোপামুদ্রা প্রভৃতি।


উৎপত্তি ও ব্যবহারের রীতিনীতি

সংস্কৃত শব্দ véda " জ্ঞান" মূল বে- থেকে উৎপত্তি নির্ণয় করা হল " জানতে "। এটি চার বিধিসম্মত বেদের সঙ্গে সহযোগী (ঋগ্বেদ, যজু বেদ, সাম বেদ ও অথর্ব বেদ) যদিও তথ্যসূত্র অনুযায়ী এটি যুক্ত ছিলো ব্রাহ্মন, আর্য এবং উপনিষদের সাথে। বেদের এক নাম শ্রুতি। এর কারণ, লিপিবদ্ধ হওয়ার আগে দীর্ঘকাল বেদ ছিল মানুষের স্মৃতিতে বিধৃত



গুরুশিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি অর্থাৎ শ্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেদ আয়ত্ত করা হতো। যেহেতু শোনা বা শ্রুতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ঘটত তাই এ থেকে বেদের এক নাম হয় শ্রুতি। বেদকে ত্রয়ীও বলা হয়। এর কারণ, বেদের মন্ত্রগুলি আগে ছিল বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। ব্যাসদেব যজ্ঞে ব্যবহারের সুবিধার্থে মন্ত্রগুলিকে ঋক্, যজুঃ, সাম এই তিন খণ্ডে বিন্যস্ত করেন। তাই বেদের অপর নাম হয় সংহিতা। বেদ চারখানা হলেও চতুর্থ অথর্ববেদ অনেক পরবর্তীকালের রচনা এবং এর কিছু কিছু মন্ত্র প্রথম তিনটি থেকেই নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া যজ্ঞে এর ব্যবহার নেই। অবশ্য বেদকে ত্রয়ী বলার অন্য একটি কারণও আছে এবং তা হলো: এর মন্ত্রগুলি মিতত্ব, অমিতত্ব ও স্বরত্ব এই তিনটি স্বরলক্ষণ দ্বারা বিশেষায়িত, যার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রগুলিকে উপর্যুক্ত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।বেদের রচনাকাল সম্পর্কে অনেক মতভেদ আছে। এ নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্যও দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, বেদ রচনার শুরু থেকে তা সম্পূর্ণ হতে বহুকাল সময় লেগেছে। সেই কালসীমা মোটামুটিভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০-৯৫০ অব্দ পর্যন্ত ধরা হয়। :   

Ekadoshi

তর্পণ বিধি

 আমি প্রথমেই মহালয়া বিষয়ে দু'একটা কথা বলে নিই, তারপর  তর্পণ নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।  মহালয়া মানে শুধু মায়ের আগমন নয়, মহাল...

চারবর্ণের অশৌচ ব্যবস্তা